পদ না পেয়ে ফেসবুক লাইভে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ছাত্রদল নেতা নয়ন

ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের নবগঠিত ৩১১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান না পেয়ে ফেসবুক লাইভে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ছাত্রদল নেতা আহসান উল্লাহ নয়ন। ত্যাগ ও আন্দোলনের পরও মূল্যায়ন না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তিনিসহ একাধিক নেতাকর্মী।

May 4, 2026 - 01:07
 0  8
পদ না পেয়ে ফেসবুক লাইভে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ছাত্রদল নেতা নয়ন

ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সদ্য ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিকে ঘিরে দলের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। কাঙ্ক্ষিত পদ না পেয়ে ফেসবুক লাইভে এসে প্রকাশ্যে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্থানীয় ছাত্রদল নেতা আহসান উল্লাহ নয়ন। মাত্র দুই মিনিট সাত সেকেন্ডের সেই আবেগঘন ভিডিও মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (২ মে) রাত ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীনের স্বাক্ষরে ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের ৩১১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন এই কমিটিতে সভাপতি হিসেবে আজিজুল হাকিম আজিজ ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মো. রাকিব হোসেনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

লাইভে এসে যা বললেন নয়ন

কমিটি প্রকাশের পর রাত প্রায় ১১টার দিকে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে আসেন আহসান উল্লাহ নয়ন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম, হরতাল-অবরোধে রাজপথে থেকেও তাকে কমিটিতে রাখা হয়নি। অথচ ৫ আগস্টের পর যারা দলে এসেছেন, তাদের অনেককেই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ তার।

নয়ন আরও বলেন, “আমরা জীবনের সবকিছু হারিয়ে দলের জন্য কাজ করেছি। আমাদের গায়ে জঙ্গি তকমা পর্যন্ত লাগানো হয়েছে। অথচ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন অনেকেই এখন কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। এত ত্যাগের পরও যদি দলীয় পরিচয় না মেলে, তাহলে বেঁচে থাকার অর্থ কী?”

চাকরি হারানোর পেছনেও দলীয় পরিচয়

লাইভ ভিডিওতে নয়ন তার ব্যক্তিগত জীবনের একটি ক্ষতিকর অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে তার চাকরি প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। প্রশিক্ষণের ১৩ দিন পার হওয়ার পর পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় এলাকার কিছু লোক তার ছাত্রদলের পোস্টার দেখানোয় শেষ পর্যন্ত তার চূড়ান্ত নিয়োগ বাতিল হয়ে যায়।

আহসান উল্লাহ নয়ন ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ভাবখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আব্দুল হাইয়ের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।

ক্ষোভ আরও নেতার, প্রশ্নবিদ্ধ কমিটি গঠন প্রক্রিয়া

শুধু নয়ন একা নন, কমিটি ঘোষণার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মহানগর ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাদ আকন্দ সাব্বিরও। নিজের ফেসবুক পোস্টে সাব্বির অভিযোগ করেন, কমিটি গঠনের আগে সুপার ফাইভের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক একতরফাভাবে এই কমিটি ঘোষণা করেছেন, যা সংগঠনের রীতি ও নিয়মের পরিপন্থী বলে দাবি তার।

সাব্বির আরও অভিযোগ করেন, ঘোষিত কমিটিতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমন অনেককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যোগ্যতা ও সিনিয়রিটি বিবেচনায় না নেওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ের ত্যাগী কর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে।

নেতৃত্বের ব্যাখ্যা

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সদ্য ঘোষিত সভাপতি আজিজুল হাকিম বলেন, এই ইউনিটের হাজার হাজার নেতাকর্মী বিগত সময়ে জেল-জুলুম ও মামলার শিকার হয়েছেন। সক্রিয় ও ত্যাগী কর্মীদের যথাযথভাবেই মূল্যায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। লাইভে এসে কান্নার ভিডিওটি তার নজরে এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, কমিটি ঢালাওভাবে যে ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা বাস্তবসম্মত নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ৩১১ জনের বড় কমিটিতেও সবাইকে পদে রাখা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকা কর্মীরা এবার পদ পেয়েছেন। তারা আরও জানান, আহসান উল্লাহ নয়ন আগের জেলা কমিটিরও কোনো পদে ছিলেন না; তিনি দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রোকনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

পুনর্বিবেচনার তাগিদ বিএনপি নেতার

দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকনুজ্জামান রোকন বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, তাদের কমিটিতে উপযুক্ত মূল্যায়ন হয়েছে কিনা—সেটি পুনরায় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কেন এত আলোচনায় ঘটনাটি

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কমিটি গঠন নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসার ঘটনা নতুন নয়। তবে দলীয় কর্মসূচির বাইরে এসে ফেসবুক লাইভে কান্নায় ভেঙে পড়ে কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলে নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি ও পুরোনো ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন প্রশ্নে এ ঘটনাটি দেশের ছাত্ররাজনীতিতে আবারও নতুন বিতর্কের দরজা খুলে দিয়েছে।

শেষ কথা

ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের কমিটি ঘিরে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি জেলার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়—এটি দেশের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর কমিটি গঠনের সামগ্রিক প্রক্রিয়া নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ত্যাগী কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া না থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতৃত্ব এ অভিযোগগুলো কীভাবে আমলে নেয় এবং পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকছে কিনা—সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছেন দলের তৃণমূল কর্মীরা।

নিউজ প্রতিনিধি আমি Vknews24–এর একজন প্রতিনিধি হিসেবে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত আছি। সমসাময়িক ঘটনা, স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু, সমাজ-সংস্কৃতি এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করাই আমার মূল লক্ষ্য।