গিনেস বুকে নাম লেখালেন বাংলাদেশের সিফাত, চোখ বাঁধা অবস্থায় ১০ সেকেন্ডে ১০ মাস্ক পরে গড়লেন বিশ্ব রেকর্ড

চোখ বাঁধা অবস্থায় মাত্র ১০ দশমিক ৩২ সেকেন্ডে ১০টি সার্জিক্যাল মাস্ক পরে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছেন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার তরুণ সিফাত আকন। ভারতীয় এক প্রতিযোগীর গড়া পুরোনো রেকর্ড ভেঙে দিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন এই তরুণ।

May 3, 2026 - 10:47
 0  24
গিনেস বুকে নাম লেখালেন বাংলাদেশের সিফাত, চোখ বাঁধা অবস্থায় ১০ সেকেন্ডে ১০ মাস্ক পরে গড়লেন বিশ্ব রেকর্ড

বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রেকর্ডের তালিকা—গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে এবার যুক্ত হলো বাংলাদেশের আরও একটি নাম। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ধনীসাফা ইউনিয়নের ফুলজুড়ী গ্রামের ১৮ বছর বয়সী তরুণ সিফাত আকন চোখ বাঁধা অবস্থায় দ্রুততম সময়ে ১০টি সার্জিক্যাল মাস্ক পরে এই বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। তাঁর সময় লেগেছে মাত্র ১০ দশমিক ৩২ সেকেন্ড।

গত ২৮ এপ্রিল রাতে ই-মেইলের মাধ্যমে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সিফাতের এই অর্জনকে স্বীকৃতি দেয়। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রেকর্ডটির জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছিলেন তিনি।

যেভাবে শুরু হলো স্বপ্নের পথচলা

সিফাতের এই বিশ্বজয়ের গল্প শুরু হয়েছিল প্রায় চার বছর আগে। সে সময় একটি পত্রিকায় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস নিয়ে একটি প্রতিবেদন পড়ে আগ্রহ জন্মে তাঁর। কৌতূহল থেকেই খোঁজখবর নিতে শুরু করেন—বাংলাদেশের কারা এ ধরনের রেকর্ড গড়েছেন, কীভাবে আবেদন করতে হয়, কী কী নিয়ম রয়েছে।

তখন চলছিল করোনাভাইরাসের ভয়াবহ সময়। চারপাশে মাস্ক ছিল নিত্যসঙ্গী। ঠিক সেখান থেকেই মাথায় আসে অভিনব এক ভাবনা—মাস্ক পরে রেকর্ড গড়ার পরিকল্পনা। সিফাত জানতে পারেন, এর আগে একই ধরনের রেকর্ড করেছিলেন এক ভারতীয় তরুণ; তাঁর সময় ছিল প্রায় ১১ দশমিক ৫৪ সেকেন্ড। সেটিকেই লক্ষ্য করে এগিয়ে যান সিফাত।

তথ্য আর গাইডলাইনের অভাবেই বড় চ্যালেঞ্জ

সিফাত জানান, রেকর্ড গড়ার ইচ্ছা থাকলেও সবচেয়ে বড় বাধা ছিল সঠিক তথ্যের অভাব। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন, তবে পরিপূর্ণ কোনো গাইডলাইন পাননি। যাঁরা আগে রেকর্ড করেছেন, তাঁদের ই-মেইলে বার্তাও পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি।

পুরো প্রক্রিয়া—আবেদন, ভিডিও সাক্ষ্য, সাক্ষীর বিবরণসহ যাবতীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেতে তাঁর সময় লেগেছে প্রায় ৯ মাস।

ছুটির দিনগুলোতেই কঠোর অনুশীলন

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর দীর্ঘ ছুটিতে কোমর বেঁধে অনুশীলন শুরু করেন সিফাত। প্রথমদিকে প্রতিবার মাস্ক পরতে সময় লেগে যেত ২৫ থেকে ২৬ সেকেন্ড। মূল চ্যালেঞ্জ ছিল দুটি—চোখ বাঁধা থাকায় হাত দিয়ে মাস্ক খুঁজে নেওয়া, আর সঠিকভাবে দ্রুত পরে ফেলা।

দিনের পর দিন অনুশীলনে সময় কমিয়ে আনতে থাকেন তিনি। পাশে ছিলেন মা, ছোট ভাই এবং বন্ধু ইমন। শুরুতে অনেকেই হাসাহাসি করতেন, এমনকি ‘পাগলামি’ বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। তবে সিফাত হাল ছাড়েননি।

আবেদন থেকে স্বীকৃতি, তিন মাসের অপেক্ষা

প্রয়োজনীয় ভিডিও, সাক্ষীর বিবৃতি ও কাগজপত্র প্রস্তুত করে গত ১৮ জানুয়ারি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের ওয়েবসাইটে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেন সিফাত। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২৮ এপ্রিল রাতে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত ই-মেইল—যেখানে নিশ্চিত করা হয়, তিনি নতুন বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী।

সিফাত বলেন, খবরটি জানার পর তাঁর চেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন তাঁর মা।

পরিবারের গর্ব, এলাকার অহংকার

সিফাতের বাবা আবদুল জলিল আকন পেশায় একজন বনরক্ষী, মা বেগম সুরমা গৃহিণী। ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা বলেন, ১০ সেকেন্ডে ১০টি মাস্ক পরে বিশ্বরেকর্ড গড়া তাঁর কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। ভবিষ্যতে ছেলে আরও বড় কিছু করবে—এই প্রত্যাশা তাঁর।

মা বেগম সুরমা জানান, সিফাত এখানেই থামতে চান না। সামনে আরও দুটি রেকর্ড গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর—এক মিনিটে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষকে জড়িয়ে ধরার রেকর্ড এবং এক মিনিটে সর্বোচ্চসংখ্যক ‘হ্যান্ডশেক’ করার রেকর্ড।

স্থানীয় ২৪ নম্বর নিজ ফুলজুড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মামুন হোসেন বলেন, সিফাত নিজের অধ্যবসায় ও পরিশ্রমে যা করে দেখিয়েছেন, তা গোটা এলাকার জন্য গর্বের। তিনি নিজের চোখে সিফাতের রেকর্ড তৈরির দৃশ্য দেখেছেন বলে জানান।

সিফাতের বন্ধুরা বলছেন, যাঁরা একসময় তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করতেন, আজ তাঁরাই উৎসাহ দিচ্ছেন। শুরু থেকে কাছে থেকে সাহস জুগিয়েছেন বন্ধুরাও।

পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সিফাত আকন সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান তিনি। পাশাপাশি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তালিকায় নিজের নাম আরও কয়েকবার তুলে আনার স্বপ্ন বুকে নিয়েই এগোচ্ছেন।

সমাপনী কথা

প্রত্যন্ত গ্রামের একজন তরুণ, যাঁর হাতে ছিল না কোনো বড় প্ল্যাটফর্ম, ছিল না বিশেষ কোনো প্রশিক্ষকের সহায়তা—শুধু আগ্রহ, পরিকল্পনা আর নিরলস অনুশীলনকে পুঁজি করে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন বিশ্বমঞ্চে। সিফাত আকনের এই অর্জন প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায়ের সামনে কোনো সীমাবদ্ধতাই বাধা হতে পারে না। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য তাঁর গল্প নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।

নিউজ প্রতিনিধি আমি Vknews24–এর একজন প্রতিনিধি হিসেবে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত আছি। সমসাময়িক ঘটনা, স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু, সমাজ-সংস্কৃতি এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করাই আমার মূল লক্ষ্য।