জ্বালানি সরবরাহে স্বস্তি, তবে জরুরি আমদানির তেল এখনো আসেনি
দেশে আপাতত জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি নেই। ডিজেল ও অকটেনের মজুত, স্থানীয় সংগ্রহ এবং নির্ধারিত আমদানি মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার আশা করা হচ্ছে। তবে বিকল্প উৎস থেকে জরুরি ভিত্তিতে আনার কথা ছিল যে তেল, তা গত দুই মাসেও দেশে পৌঁছেনি।
দেশে এখনই জ্বালানি তেলের বড় ধরনের সংকট নেই—সরকারি হিসাব ও সরবরাহ পরিস্থিতি অন্তত সে কথাই বলছে। বাজারে আগের তুলনায় চাপ কিছুটা কমেছে, ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইন কমে এসেছে। তবে এই স্বস্তির মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ রয়ে গেছে: বিকল্প উৎস থেকে জরুরি ভিত্তিতে আনার পরিকল্পনা করা জ্বালানি তেল এখনো দেশে পৌঁছেনি।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মাথায় রেখে সরকার সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়ায় নতুন উৎস থেকে তেল আনার উদ্যোগ নিয়েছিল। এ উদ্যোগে বিদেশি ৫৬টি কোম্পানি আগ্রহ দেখালেও কাজ পেয়েছে ৮টি প্রতিষ্ঠান। আরও কিছু প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রতিশ্রুত তেল সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে যে ‘জরুরি তেল’ আমদানির ওপর বাড়তি ভরসা রাখা হয়েছিল, তা এখনো কাগজেই সীমাবদ্ধ।
তবে চলতি চাহিদা সামাল দিতে সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিয়মিত আমদানি ও বিদ্যমান মজুতের ওপর নির্ভর করছে। মে মাসের হিসাবে দেশে ডিজেলের চাহিদা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার টন। এর বিপরীতে মজুত রয়েছে ২ লাখ ৮৯ হাজার টন, আর সরবরাহকারীরা জানিয়েছে—মাসের মধ্যে আরও ৩ লাখ ২৯ হাজার টন ডিজেল দেশে পৌঁছানোর কথা। অকটেনের ক্ষেত্রেও অবস্থান তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। মাসিক চাহিদা ৩৭ হাজার টনের বিপরীতে মজুত আছে ৪২ হাজার ৯৩৩ টন। এর সঙ্গে স্থানীয় উৎস থেকে ২৪ হাজার টন এবং আমদানির মাধ্যমে আরও ২৬ হাজার টন অকটেন পাওয়ার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই হিসাব অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে সরবরাহ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি নেই। বরং নিয়মিত চালান সময়মতো পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক থাকবে। সামনে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে, আরও কয়েকটি চালান নিয়েও আলোচনা চলছে। এসব চালান নির্ধারিত সময়ে এলে সামগ্রিক চাপ কমবে।
তবু প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে—জরুরি ভিত্তিতে অনুমোদন পাওয়া তেল এল না কেন? খাতসংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা, নির্বাচিত অনেক প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব সরবরাহ কাঠামো শক্তিশালী নয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মূলত বাণিজ্যভিত্তিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে; বড় পরিসরে জ্বালানি সংগ্রহ, পরিবহন ও ডেলিভারির বাস্তব সক্ষমতা তাদের সীমিত। অভিজ্ঞতার ঘাটতি, আর্থিক শর্ত পূরণে বিলম্ব এবং প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা জমা দিতে না পারার কারণেও কিছু চুক্তি এগোয়নি।
এমনই একটি ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত একটি কোম্পানিকে এক লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দিতে না পারায় সেই বরাদ্দ বাতিল হয়ে যায়। সূত্র বলছে, এ ধরনের আরও কয়েকটি প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগেই আটকে গেছে। ফলে জরুরি আমদানির যে বিকল্প ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, তা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।
বিপিসির অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনায় সাধারণত বছরে দুই দফায় ছয় মাসের জন্য তেল কেনার রূপরেখা থাকে। এর একটি অংশ সরকার-টু-সরকার চুক্তির মাধ্যমে, আর বাকি অংশ উন্মুক্ত দরপত্রে সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জরুরি সরাসরি ক্রয়ের বিষয়টি সামনে আসায় নিয়মিত ক্রয়পরিকল্পনায় বিলম্ব তৈরি হয়েছে। এখন জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ের জন্য নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যাতে পরবর্তী সময়ে সরবরাহচক্রে আর চাপ না পড়ে।
জ্বালানি বাজারে আতঙ্কও পরিস্থিতিকে কিছু সময়ের জন্য জটিল করেছিল। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ না হলেও অনিশ্চয়তার খবরে অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনতে শুরু করেন। এতে কিছু এলাকায় কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়। তবে মজুত ও আগত চালানের তথ্য প্রকাশের পর বাজারের অস্থিরতা কিছুটা কমেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো পরিকল্পিত আমদানির সময়সূচি ঠিক রাখা এবং জরুরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ে আরও কঠোর হওয়া। শুধু প্রস্তাব বা অনুমোদন দিয়ে নয়, সরবরাহ সক্ষমতা, আর্থিক গ্যারান্টি ও আন্তর্জাতিক লজিস্টিক নেটওয়ার্ক যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে কাগজে মজুতের হিসাব স্বস্তিদায়ক থাকলেও বাস্তবে সরবরাহ ব্যবস্থায় আবারও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, দেশের জ্বালানি সরবরাহ এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে—এটি সরকারের জন্য স্বস্তির খবর। কিন্তু যে জরুরি আমদানির ওপর বিকল্প নিরাপত্তা বলয় তৈরি করার কথা ছিল, তা বাস্তবে কার্যকর না হওয়া ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। নিয়মিত আমদানি, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বাসযোগ্য সরবরাহকারীর সমন্বয়ই এখন জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখার প্রধান শর্ত।