মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত, আহত আরও ৭ — পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত, ৭ জন আহত। আমিরাত ও বাহরাইনে ঘটনা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও অন্তত সাতজন। সোমবার (২ মার্চ, ২০২৬) বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সরকারি বিবৃতিতে এই মর্মান্তিক তথ্য নিশ্চিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বাংলাদেশি কর্মীরা আক্রান্ত হওয়ার এই খবর দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও শোকের ছায়া ফেলেছে।
নিহত দুজনের মধ্যে একজন হলেন সালেহ আহমেদ (৪৮)। তিনি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার গাজিটেকা (বাঁশতলা) গ্রামের মৃত সবর আলীর ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে পানির ডেলিভারি গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। ইফতারের পর সহকর্মীর সঙ্গে জরুরি খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করতে বেরিয়েছিলেন সালেহ। ঠিক সেই সময় আকাশে উজ্জ্বল বস্তু দেখা যায় এবং বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আহত সালেহকে স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স ও পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়, কিন্তু চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দ্বিতীয় নিহত হলেন মোহাম্মদ তারেক (৪৮), যিনি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার আজিমপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনি প্রাণ হারান। মানামায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা এবং বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. রইস হাসান সরোয়ার এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। একই হামলায় আরও দুইজন বাংলাদেশি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
কুয়েতে ড্রোন হামলায় চারজন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন — ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের আমিনুল ইসলাম, পাবনার সাথিয়ার রবিউল ইসলাম, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের মাসুদুর রহমান এবং কুমিল্লার চান্দিনার দুলাল মিয়া। তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানে সবাই স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন। কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস নিয়মিত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং রাষ্ট্রদূত নিজেও হাসপাতালে তাদের দেখতে গেছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত ৬০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন প্রবাসীরা সতর্ক থাকেন এবং স্থানীয় সরকারের নির্দেশনা মেনে চলেন। বাণিজ্যিক ফ্লাইট পুনরায় চালু হলেই নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ 'বাংলার জয়যাত্রা' বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে অবস্থান করছে। দূতাবাস জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং সকল ক্রু সদস্য নিরাপদ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের মৃত্যুর পর, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে পাল্টা অভিযান শুরু করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই হামলায় মোট তিনজন নিহত হয়েছেন — একজন বাংলাদেশি, একজন পাকিস্তানি এবং একজন নেপালি নাগরিক। আহত হয়েছেন বিভিন্ন জাতীয়তার ৫৮ জন। ইরান ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ৫৪১টি ড্রোন ব্যবহার করে এই আক্রমণ পরিচালনা করেছে বলে জানা গেছে।
এই ঘটনায় সারা দেশে নিহত প্রবাসীদের পরিবারের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের পরিবারগুলো চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনমানে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত সকল বাংলাদেশি প্রবাসী যেন অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে না বেরোন এবং দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।