প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে আগুন লাগিয়েছে কর্মচারীরাই, ৫ লাখ টাকার চুক্তিতে নাশকতা
রাজধানীর মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের স্টোরে লাগা আগুন কোনো দুর্ঘটনা নয়—৫ লাখ টাকার চুক্তিতে অধিদপ্তরের কর্মচারীরাই বোরকা পরে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনায় তিনজন গ্রেপ্তার, পুড়েছে ২০২টি ল্যাপটপ, নিখোঁজ আরও ৮৩টি।
রাজধানীর মিরপুরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের নতুন ভবনে লাগা আগুনের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে—এটি কোনো সাধারণ অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং পরিকল্পিত নাশকতা। আর এই নাশকতার পেছনে রয়েছেন খোদ অধিদপ্তরেরই কয়েকজন কর্মচারী। জানা গেছে, পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে স্টোররুমে আগুন লাগানো হয়েছিল।
ভোররাতের রহস্যময় আগুন
গত শুক্রবার ভোর প্রায় চারটার দিকে অধিদপ্তরের নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলার স্টোররুমে হঠাৎ আগুন লেগে যায়। খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর দেখা যায়, স্টোরে রক্ষিত মূল্যবান সরকারি মালামাল ও ল্যাপটপের একটি বড় অংশ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শুরুতে এটিকে শর্ট সার্কিটজনিত দুর্ঘটনা মনে করা হলেও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার পর পাল্টে যায় পুরো চিত্র।
সিসিটিভিতে ধরা পড়ে বোরকা পরা ব্যক্তি
ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার সময় পুলিশ একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখতে পায়—বোরকা পরিহিত এক ব্যক্তি গভীর রাতে স্টোররুমে ঢুকছেন। ভেতরে কিছুক্ষণ অবস্থান করে তিনি ল্যাপটপ চুরি করেন এবং প্রমাণ ধ্বংস করতে আগুন লাগিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। এই ফুটেজই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
গ্রেপ্তার তিন কর্মচারী, মূল হোতা স্টোরকিপার
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মোস্তাক সরকার বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, বোরকা পরে আগুন লাগানো ব্যক্তিটি আসলে অধিদপ্তরের স্টোরকিপার মোহাম্মদ আসমাউল ইসলাম। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনায় জড়িত আরও কয়েকজনের নাম প্রকাশ করেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন—
- মোহাম্মদ আসমাউল ইসলাম, স্টোরকিপার
- মোহাম্মদ জিনাত আলী বিশ্বাস (৫৫), স্টোর ইনচার্জ
- মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির খান (৫৯), মাস্টাররোলে নিয়োজিত স্টোরকিপার
এ ছাড়া হৃদয় নামে আরও একজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ। তাকেও শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
পুড়েছে শতাধিক ল্যাপটপ, নিখোঁজ আরও ৮৩টি
স্টোররুমে মোট ৭৩৫টি ল্যাপটপ মজুত ছিল, যেগুলো মাঠপর্যায়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কাজে বিতরণের কথা ছিল। আগুনে এর মধ্যে ২০২টি ল্যাপটপ সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ৮৩টি ল্যাপটপ এখনো নিখোঁজ। অর্থাৎ আগুন লাগানোর আগেই সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছিল বলে ধারণা করছে তদন্তকারী সংস্থা।
পুলিশ মনে করছে, ল্যাপটপ চুরি করে সেই চুরির আলামত ঢাকতেই আগুন লাগানো হয়েছিল। অর্থাৎ অগ্নিসংযোগ ছিল মূলত প্রমাণ মুছে ফেলার একটি কৌশল।
পাঁচ লাখ টাকার চুক্তিতে আগুন
তদন্তে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশকে জানিয়েছেন, এই অগ্নিসংযোগের জন্য তাদেরকে পাঁচ লাখ টাকার আর্থিক প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল। কে বা কারা এই অর্থের জোগানদাতা—তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ডিসি মোস্তাক সরকার বলেন, “ল্যাপটপগুলো সরকারিভাবে ক্রয় করা হয়েছিল এবং বিতরণের জন্য কমিটির হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঠিক বিতরণের ঠিক আগমুহূর্তে কেন আগুন লাগানো হলো, এর পেছনে কারা আছে—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
মামলা দায়ের, তদন্ত চলছে
ঘটনার পরপরই অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনার পেছনে কোনো বৃহত্তর চক্র জড়িত কি না, কোনো অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক স্বার্থ রয়েছে কি না—তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
প্রশ্নবিদ্ধ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা
সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তরের ভেতরে কর্মরত কর্মচারীরাই যখন এমন নাশকতার সঙ্গে জড়িত হন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। স্টোররুমের নিরাপত্তা, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং নৈশকালীন তদারকি কতটা কার্যকর ছিল—তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে শিক্ষা প্রশাসনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় শুধু সিসিটিভি স্থাপনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহিতা ও নিয়মিত নিরীক্ষা।
পাঠকের জন্য সমাপনী মন্তব্য
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির ওপরও আঘাত। মাঠপর্যায়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ সরকারি সম্পদ যখন ভেতরের লোকজনের যোগসাজশে পুড়ে যায়, তখন তা গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই উদ্বেগজনক। পুলিশের চলমান তদন্তে মূল হোতা ও অর্থের জোগানদাতাদের পরিচয় উন্মোচিত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে জন্য সরকারি দপ্তরগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার কাঠামো ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।