তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ, দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় গুরুত্ব পেল পানি ব্যবস্থাপনা

বেইজিংয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিআরআই সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতেও দুই দেশ গুরুত্ব দিয়েছে।

May 7, 2026 - 02:31
 0  12
তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ, দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় গুরুত্ব পেল পানি ব্যবস্থাপনা

তিস্তা নদীকেন্দ্রিক বহুল আলোচিত উন্নয়ন উদ্যোগে চীনের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-চীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ও সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে ঢাকা। একই সঙ্গে দুই দেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা, বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ একাধিক আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনা করেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের চীন সফরের সময় এ আলোচনা হয়। বৈঠকে দুই পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার বিষয়ে একমত হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতায় চীনের দীর্ঘদিনের ভূমিকার প্রশংসাও করা হয়।

তিস্তা প্রকল্পের প্রসঙ্গ সামনে এনে বাংলাদেশ স্পষ্ট করেছে, দেশের উত্তরাঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, কৃষি সহায়তা এবং নদীকেন্দ্রিক জনজীবনে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এ প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তা-ভিত্তিক এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে নীতিনির্ধারক মহলে ধারণা রয়েছে।

সরকারি পর্যায়ের আলোচনার প্রেক্ষাপট বলছে, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, ভাঙন, খরার মৌসুমে পানি সংকট এবং বর্ষায় বন্যার ঝুঁকির সঙ্গে এর সম্পর্ক গভীর। সে কারণে তিস্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে যেকোনো বড় উদ্যোগকে শুধু অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক উন্নয়ন, কৃষি সুরক্ষা এবং জনস্বার্থের প্রশ্ন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীন উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা করে। দুই দেশ অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, পানি সম্পদ, স্বাস্থ্য এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কাজ জোরদার করার আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করে। এতে বোঝা যাচ্ছে, তিস্তা প্রকল্পকে ঢাকায় এখন কেবল একটি পৃথক নদী প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামোর মধ্যেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকটও বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য ছিল। এ বিষয়ে চীন আবারও জানায়, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সংলাপভিত্তিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করার প্রচেষ্টায় তারা সহায়তা অব্যাহত রাখবে। বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, কারণ দীর্ঘদিন ধরে এ সংকট শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপও তৈরি করছে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা চাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত। কারণ তিস্তা অববাহিকায় নদী শাসন, পানি সংরক্ষণ, ভাঙন রোধ এবং কৃষি সহায়তা—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি বহুস্তরীয়। এর বাস্তবায়নে অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—তিনটিই জরুরি। চীনের মতো বড় উন্নয়ন অংশীদারের সম্পৃক্ততা সেই হিসাবেই আলোচনায় এসেছে।

তবে তিস্তা প্রশ্নটি সব সময়ই শুধু উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গও জড়িয়ে থাকে। এ কারণে সরকারিভাবে যেসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, সেখানে কূটনৈতিক ভারসাম্যও বজায় রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকাশ্যে উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের দিকটিকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

চীন সফরের বৈঠকে দুই দেশ পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা বাড়ানো, উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয় এবং বিদ্যমান কৌশলগত সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার কথাও বলেছে। পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, বহুপাক্ষিকতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ন্যায়সংগত কাঠামোর প্রতি সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

তিস্তা নিয়ে নতুন এই কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট—বাংলাদেশ প্রকল্পটিকে আবারও সামনে আনছে এবং বাস্তব অগ্রগতি চায়। উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি উৎপাদন ও নদীভাঙনকবলিত এলাকার ভবিষ্যৎ বিবেচনায় তিস্তা এখন শুধু আলোচনার বিষয় নয়, বাস্তব সিদ্ধান্তেরও দাবি রাখে। চীনের সহযোগিতা চাওয়ার মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই নতুন করে স্পষ্ট করল ঢাকা।

নিউজ প্রতিনিধি আমি Vknews24–এর একজন প্রতিনিধি হিসেবে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত আছি। সমসাময়িক ঘটনা, স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু, সমাজ-সংস্কৃতি এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করাই আমার মূল লক্ষ্য।