আবর্জনা থেকে গড়ে উঠছে কোটি টাকার সম্ভাবনা, রূপগঞ্জে ফেলনা কাগজেই নতুন বোর্ড শিল্প

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ফেলে দেওয়া পুরনো কাগজ পুনর্ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের বোর্ড। এই বোর্ড দিয়ে বানানো হচ্ছে মিষ্টির বাক্স, জুতার কার্টন, খাতা-ফাইলের কভারসহ নানা প্যাকেজিং পণ্য। এতে যেমন কমছে বর্জ্য ও পরিবেশদূষণ, তেমনি তৈরি হচ্ছে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান।

May 5, 2026 - 14:50
 0  6
আবর্জনা থেকে গড়ে উঠছে কোটি টাকার সম্ভাবনা, রূপগঞ্জে ফেলনা কাগজেই নতুন বোর্ড শিল্প

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ফেলে দেওয়া কাগজ এখন আর কেবল আবর্জনা নয়, তা-ই হয়ে উঠছে নতুন অর্থনীতির কাঁচামাল। ব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত কাগজ সংগ্রহ করে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের বোর্ড, যা দিয়ে বানানো হচ্ছে মিষ্টির প্যাকেট, জুতার বক্স, খাতা-ফাইলের কভার, এমনকি দামী ইলেকট্রনিক্স পণ্যের প্যাকেজিং বক্সও। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা এ শিল্প একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে তেমনি নিম্ন ও মধ্যআয়ের বহু মানুষের জীবিকায় নতুন সুযোগ তৈরি করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর, ভুলতা, মুড়াপাড়া ও পাবই এলাকাজুড়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে বোর্ড তৈরির ছোট-বড় একাধিক কারখানা। সংখ্যায় প্রায় ২০টির মতো এসব বোর্ড মিল এখন ওই অঞ্চলের একটি আলাদা শিল্পপরিচয় তৈরি করেছে। আগে যেসব এলাকা সাধারণ শিল্পাঞ্চল হিসেবেই পরিচিত ছিল, এখন সেগুলো পুনর্ব্যবহৃত কাগজভিত্তিক বোর্ড উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে।

এই শিল্পের মূল শক্তি হচ্ছে ফেলনা কাগজ। ব্যবহৃত পুরোনো কাগজ সংগ্রহ করে প্রথমে তা মেশিনে মণ্ডে রূপান্তর করা হয়। এরপর আধুনিক প্রক্রিয়ায় সেই মণ্ড থেকে তৈরি হয় শক্ত ও ব্যবহারযোগ্য বোর্ড। বাজারে প্যাকেজিং পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের বোর্ডের ব্যবহারও বেড়েছে। ফলে যেটি একসময় ড্রেন, খাল বা সড়কের পাশে জমে থেকে পরিবেশ দূষণের কারণ হতো, সেটিই এখন উৎপাদনশীল সম্পদে পরিণত হচ্ছে।

এ শিল্পের বড় দিক হলো, এটি সরাসরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। ফেলে দেওয়া কাগজ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় নতুন কাগজ তৈরির চাপ কিছুটা কমে, কমে কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা। একই সঙ্গে গাছ কাটার প্রবণতা কমানোর ক্ষেত্রেও পুনর্ব্যবহারভিত্তিক এ উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আগের তুলনায় আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাগজের বর্জ্যও কমেছে, যা নোংরা পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যাও কিছুটা লাঘব করছে।

শুধু পরিবেশ নয়, রূপগঞ্জের এই বোর্ড শিল্প বদলে দিচ্ছে বহু মানুষের জীবনযাত্রা। বর্জ্য সংগ্রহকারী, পরিবহনকর্মী, কারখানার শ্রমিক, প্যাকেজিং-সম্পর্কিত ছোট ব্যবসায়ী—অনেকেই এ খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিয়মিত আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। গ্রামীণ ও উপশহরভিত্তিক অর্থনীতিতে এমন উদ্যোগের প্রভাব সাধারণত দ্রুত দৃশ্যমান হয়, কারণ এখানে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে শ্রমনির্ভর কাজের সুযোগ তৈরি হয়।

স্থানীয় বাজারে চাহিদা মিটিয়ে রূপগঞ্জের এসব কারখানায় তৈরি বোর্ড দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিষ্টির কার্টন, জুতার বাক্স, নানা ধরনের প্যাকেজিং কভার এবং শিক্ষা-সামগ্রী সংশ্লিষ্ট পণ্যে এসব বোর্ডের ব্যবহার বাড়ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, পুনর্ব্যবহৃত কাগজনির্ভর বোর্ড কেবল সস্তা বিকল্প নয়; বরং এটি এখন বাস্তবভিত্তিক, কার্যকর এবং বাজারযোগ্য একটি পণ্য।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত সহায়তা পেলে এই শিল্প আরও বড় আকার নিতে পারে। বিশেষ করে প্যাকেজিং শিল্প, ক্ষুদ্র উৎপাদন খাত, খাতা-ফাইল ও শিক্ষা-সামগ্রী বাজারে এর ব্যবহার আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। দেশে কাগজ ও পেপারবোর্ডভিত্তিক শিল্পের প্রসার এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিয়ে বাড়তি আলোচনার মধ্যে রূপগঞ্জের এই মডেলটি অন্য এলাকাগুলোর জন্যও উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ ধরনের কারখানাকে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্জ্যপণ্যকে পুনর্ব্যবহার করে উৎপাদনে আনা গেলে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে তেমনি স্থানীয় শিল্পভিত্তিও শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশে শিল্পবর্জ্য ও নগরবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ; সে জায়গায় পুনর্ব্যবহারভিত্তিক শিল্পগুলো বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ দেখাতে পারে।

সব মিলিয়ে রূপগঞ্জের ফেলনা কাগজভিত্তিক বোর্ড শিল্প শুধু একটি কারখানা-কেন্দ্রিক ব্যবসা নয়, এটি পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিকে একসঙ্গে ছুঁয়ে থাকা একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। সঠিক পরিকল্পনা, মাননিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা গেলে এ খাত ভবিষ্যতে আরও বড় শিল্পে রূপ নিতে পারে। তখন আবর্জনা আর শুধু বর্জ্য থাকবে না, বরং সেটিই হয়ে উঠবে টেকসই উন্নয়ন ও আয়ের নতুন ভিত্তি।

নিউজ প্রতিনিধি আমি Vknews24–এর একজন প্রতিনিধি হিসেবে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত আছি। সমসাময়িক ঘটনা, স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু, সমাজ-সংস্কৃতি এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করাই আমার মূল লক্ষ্য।