ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধাক্কা, নষ্ট ২৩০ থেকে ২৮০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অঙ্কের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ সামনে এসেছে। গবেষণা সংস্থার হিসাব, হামলা ও ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-সহ নানা ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২৩০ থেকে ২৮০ কোটি ডলারে।
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সংবাদভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের বাহিনীর ভুল আক্রমণ মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২৩০ থেকে ২৮০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে। এ হিসাব সামনে আসার পর যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থান, প্রস্তুতি এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের, সংক্ষেপে সিএসআইএসের, হিসাবকে ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বলা হচ্ছে—এই ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় রয়েছে উন্নত যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার এবং আকাশভিত্তিক নজরদারি প্ল্যাটফর্ম। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা আংশিক হিসাব; প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতেই একাধিক বড় ধরনের ক্ষতির ঘটনা ঘটে। মার্চের শুরুতে কুয়েতে একটি ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এর ঘটনায় তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এমন ঘটনা শুধু সরঞ্জাম ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি যুদ্ধক্ষেত্রে সমন্বয়, সনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং কমান্ড কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতির একটি হিসেবে আলোচনায় এসেছে থাড-সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার ধ্বংসের ঘটনা। এই রাডার শত্রুপক্ষের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, এমনকি কিছু হাইপারসনিক হুমকিও শনাক্ত করতে সক্ষম। কিছু প্রতিবেদনে অন্তত একটি, আবার কোথাও দুটি রাডার ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। এতে ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪৮ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৯৭ কোটি ডলারের মধ্যে। এ ধরনের রাডার নষ্ট হওয়া শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, সংশ্লিষ্ট ঘাঁটির আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে।
আরেকটি বহুল আলোচিত ঘটনা ঘটে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে। সেখানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি বিমান ধ্বংস হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মকে সাধারণভাবে ‘উড়ন্ত রাডার’ বলা হয়, কারণ এটি আকাশে থেকে বহু দূরের বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য হুমকি শনাক্ত করে যুদ্ধ পরিচালনায় তাৎক্ষণিক সহায়তা দেয়। এর আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি ডলার। এ ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের আকাশযুদ্ধ পরিচালনা ও সমন্বয় সক্ষমতায় তাৎপর্যপূর্ণ ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ, সংঘাত-সংশ্লিষ্ট বহু তথ্য সামরিক ও রাজনৈতিক কারণে প্রকাশ করা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র যেসব ঘাঁটি ব্যবহার করছে, সেসব স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণও প্রকাশ্যে আসেনি। স্যাটেলাইট চিত্রের সীমিত প্রাপ্যতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনায় কী ধরনের সরঞ্জাম ছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা না যাওয়ায় প্রকৃত হিসাব করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধব্যয় নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান-সম্পর্কিত এই যুদ্ধ এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করিয়েছে। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়, এই ব্যয়ের বড় অংশই গেছে গোলাবারুদ ও সামরিক অভিযান পরিচালনায়। ফলে শুধু ধ্বংস হওয়া সরঞ্জাম নয়, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামগ্রিক আর্থিক চাপও দ্রুত বেড়েছে।
এদিকে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, যুদ্ধ এবং আগের সহায়তা কর্মসূচিতে ক্ষয় হওয়া গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম পুনরায় মজুত করতে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে। এর অর্থ, সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে ওয়াশিংটনের ওপর আর্থিক চাপ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনেও বাড়ছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের প্রতিরক্ষা ব্যয়, যুদ্ধের ফলাফল এবং জনমতের সম্পর্ক এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংঘাত আবারও দেখিয়ে দিল—প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর সেনাবাহিনী থাকলেই সব ক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত হয় না। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক অস্ত্র ও প্ল্যাটফর্ম, অন্যদিকে ইরানের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অসম যুদ্ধকৌশল—এই দুইয়ের সংঘাতে যুদ্ধের ময়দানে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্যয়বহুল প্ল্যাটফর্মগুলো যদি তুলনামূলক কম খরচের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তা বড় সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে।
সব মিলিয়ে, ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের এই ক্ষয়ক্ষতি শুধু কয়েকটি সরঞ্জাম হারানোর খবর নয়; এটি যুদ্ধের প্রকৃতি, প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সামরিক ব্যয়ের বাস্তবতা—সবকিছুকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। চূড়ান্ত হিসাব এখনো অজানা থাকলেও এটুকু পরিষ্কার, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই এই ক্ষতির রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।