৮৮ হাজার করদাতার আয়কর রিটার্ন যাচাই করবে এনবিআর, অটোমেটেড বাছাইয়ে জোর
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৩-২৪ করবর্ষে জমা পড়া প্রায় ৮৮ হাজার করদাতার আয়কর রিটার্ন যাচাই–বাছাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। দুই ধাপে এসব রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এনবিআরের ভাষ্য, পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় হওয়ায় এতে মানবিক হস্তক্ষেপের সুযোগ ছিল না।
এনবিআর সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে গত জুলাইয়ে ১৫ হাজার ৪৯৪টি রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য বাছাই করা হয়। পরে দ্বিতীয় ধাপে আরও ৭২ হাজার ৩৪১টি রিটার্ন নির্বাচন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে নিরীক্ষার আওতায় এসেছে প্রায় ৮৮ হাজার রিটার্ন।
কর প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, রিটার্নে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত আয়, ব্যয়, সম্পদ বা করপরিশোধের তথ্যের অসামঞ্জস্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতেই এই যাচাই কার্যক্রম। কোনো করদাতা ভুল তথ্য দিয়েছেন কি না, কর কম দেখিয়েছেন কি না, বা প্রযোজ্য কর ঠিকভাবে পরিশোধ করেছেন কি না—এসব বিষয় নিরীক্ষার সময় দেখা হবে।
অটোমেটেড পদ্ধতিতে বাছাই
এবারের নিরীক্ষা বাছাইয়ে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করেছে এনবিআর। দ্বিতীয় ধাপে ঝুঁকিভিত্তিক মানদণ্ড অনুসরণ করে রিটার্ন নির্বাচন করা হয়েছে। আর প্রথম ধাপে ছিল র্যান্ডম বা দৈবচয়নভিত্তিক বাছাই। এনবিআরের দাবি, এতে নিরীক্ষা নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করা সম্ভব হবে।
প্রতিটি কর সার্কেলের জন্য কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ধরে সর্বোচ্চ ২০০ জন এবং সর্বনিম্ন ২০ জন করদাতাকে নিরীক্ষার তালিকায় রাখা হয়েছে। এই কাঠামো অনুসরণ করায় বাছাই প্রক্রিয়ায় ইচ্ছামতো কাউকে অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার সুযোগ কমেছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
রিটার্নদাতা ও টিআইএনধারীর সংখ্যা
বর্তমানে দেশে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী বা টিআইএনধারী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চলতি সময়ে সাড়ে ৪২ লাখের বেশি করদাতা আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন। সেই বিপুল সংখ্যক রিটার্নের মধ্য থেকে নিরীক্ষার জন্য একটি অংশ নির্বাচন করা হয়েছে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, সব রিটার্ন একসঙ্গে বিশদভাবে যাচাই করা প্রশাসনিকভাবে সম্ভব নয়। তাই ঝুঁকিভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বাছাই পদ্ধতি কার্যকর হলে প্রকৃত অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হয়, আবার সাধারণ করদাতার জন্যও প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়।
তালিকা প্রকাশ করেছে এনবিআর
নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত টিআইএনধারীদের তালিকা এনবিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট করদাতারা জানতে পারবেন তাঁদের রিটার্ন যাচাইয়ের আওতায় পড়েছে কি না। এ ধরনের প্রকাশ্য তালিকা দেওয়াকে কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনবিআর মনে করছে, প্রযুক্তিনির্ভর এই পদ্ধতি শুধু নিরীক্ষা প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ করবে না, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও সহায়ক হবে। বিশেষ করে যারা আয় ও করসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে দাখিল করেননি, তাঁদের শনাক্ত করতে এ ধরনের পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
করদাতাদের জন্য কী বার্তা
রাজস্ব বোর্ডের এই উদ্যোগ থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, রিটার্ন জমা দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়; তাতে দেওয়া তথ্যের যথার্থতাও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে করদাতাদের আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় ও করপরিশোধসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে।
সব মিলিয়ে, প্রায় ৮৮ হাজার রিটার্ন যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আয়কর ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্বচ্ছতা, কর-শৃঙ্খলা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আস্থা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে—যদি পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ ও নিয়মমাফিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়।