মমতা পদত্যাগ না করলে কী হবে, পশ্চিমবঙ্গে পরের ধাপ ঠিক করবে সংবিধান
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না করলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে—তা নির্ধারণ করবে রাজ্যপাল, বিধানসভায় আস্থা পরীক্ষা এবং নতুন সরকার গঠনের নিয়ম।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পরও যদি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না করেন, তাহলে কী হবে? ভারতের সংবিধান ও বিচারিক ব্যাখ্যা বলছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, শেষ কথা বলে বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতা। অর্থাৎ, মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকবেন কি থাকবেন না, সেটি নির্ভর করবে তিনি এখনও বিধানসভার আস্থা ভোগ করছেন কি না—তার ওপর।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে এবং তৃণমূল কংগ্রেস অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। এর পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদ ছাড়বেন না বলে অবস্থান নিলে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা দ্রুত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ঢুকে যাবে।
ভারতের সংবিধানের ১৬৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়োগ দেন রাজ্যপাল এবং মন্ত্রিসভা সমষ্টিগতভাবে রাজ্য বিধানসভার কাছে দায়বদ্ধ। সহজ ভাষায়, কোনো সরকার ততক্ষণই টিকে থাকে, যতক্ষণ বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তার পক্ষে থাকে। তাই নির্বাচনের পর যদি পরিষ্কার হয়ে যায় যে বিদায়ী সরকারের হাতে আর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, তাহলে মুখ্যমন্ত্রীর পদে বহাল থাকা রাজনৈতিকভাবে যতই দাবি করা হোক, আইনি ভিত্তি তখন দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানেই সামনে আসে রাজ্যপালের ভূমিকা। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, নির্বাচনে হেরে যাওয়া বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের কাছে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। কিন্তু তিনি যদি তা না করেন, রাজ্যপাল প্রথমে তার অবস্থান জানতে চাইতে পারেন। প্রয়োজনে তিনি বিধানসভায় আস্থা ভোট বা ফ্লোর টেস্টের নির্দেশ দিতে পারেন। আদালত বহুবার বলেছে, কোনো সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে কি না, তার পরীক্ষা রাজভবনে নয়—বিধানসভার মেঝেতেই হতে হবে।
সুতরাং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি পদত্যাগ না-ও করেন, তাতেই সরকার অনির্দিষ্ট সময় ধরে চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে না। রাজ্যপাল তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে বলতে পারেন। সেই পরীক্ষায় তিনি ব্যর্থ হলে সরকার কার্যত আর টিকবে না। তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানোই হবে পরবর্তী স্বাভাবিক সাংবিধানিক ধাপ।
এই পরিস্থিতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ইচ্ছা আর সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা এক জিনিস নয়। একজন নেতা রাজনৈতিকভাবে ফলাফল মানতে অস্বীকার করতে পারেন, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নও তুলতে পারেন; কিন্তু তাতে সংবিধানিক প্রক্রিয়া থেমে থাকে না। যদি তিনি নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ আনেন, তার আলাদা আইনি পথ আছে। কিন্তু সেই অভিযোগ বিচারাধীন থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো সরকার কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে না।
ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একাধিক রায়ে পরিষ্কার করা হয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে দ্রুত ফ্লোর টেস্টই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ। এর উদ্দেশ্য একটাই—জনমতের প্রতিফলন যেন নির্বাচিত পরিষদের ভেতরে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। তাই পশ্চিমবঙ্গে যদি বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়, তাহলে বিচারিক দৃষ্টিতেও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে বিধানসভায় শক্তি পরীক্ষা।
যদি বিদায়ী সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিজেপি তাদের বিধায়কদল থেকে নেতা নির্বাচন করে সরকার গঠনের দাবি জানাবে। রাজ্যপাল তখন সেই নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। এরপর নতুন মন্ত্রিসভা গঠন, বিধায়কদের শপথ এবং বিধানসভায় আস্থা ভোট—সবই নিয়ম মেনে এগোবে।
তবে একটি চরম পরিস্থিতির কথাও আলোচনায় আসে—যদি কোনো দল বা জোটই স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে না পারে। সে ক্ষেত্রে সংবিধানের ৩৫৬ অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতি শাসনের প্রসঙ্গ উঠতে পারে। কিন্তু এটি সাধারণ বা প্রথম পদক্ষেপ নয়; বরং শেষ অবলম্বন। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে যখন একটি দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তখন রাষ্ট্রপতি শাসনের আগে নতুন সরকার গঠনের পথই বেশি বাস্তবসম্মত ও সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি বাস্তবতা হলো, বিধানসভার মেয়াদ শেষ হলে পুরোনো পরিষদের রাজনৈতিক বৈধতাও শেষ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে নতুনভাবে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে নতুন বিধানসভা গঠন এবং নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া আর কোনো দীর্ঘমেয়াদি পথ খোলা থাকে না। অর্থাৎ, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগে অনীহা দেখালেও, তা সংবিধানকে আটকে দিতে পারে না।
সব মিলিয়ে আইন যা বলছে, তা বেশ স্পষ্ট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না করলে পশ্চিমবঙ্গে সাংবিধানিক সংকটের আলোচনার জন্ম হতে পারে, কিন্তু প্রশাসনিক শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা নয়। রাজ্যপালের হস্তক্ষেপ, প্রয়োজন হলে ফ্লোর টেস্ট, এবং শেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সরকার গঠন—এই ধারাবাহিক পথই সবচেয়ে সম্ভাব্য। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানে নয়, বিধানসভার সংখ্যায় এবং সংবিধানের বিধানেই নির্ধারিত হবে।