ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা: খামেনি নিহত, বিশ্বনেতারা যা বললেন
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত। জাতিসংঘ, রাশিয়া, ফ্রান্স, সৌদি আরবসহ বিশ্বনেতারা কে কী বললেন জেনে নিন।
ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলা চালানোর পর গোটা বিশ্বে এক তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত শনিবার (১ মার্চ ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ইরানের বিভিন্ন শহরে একযোগে হামলা চালায়। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও। এ ঘটনায় জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো একে একে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
ট্রাম্প এই সামরিক অভিযানকে 'বড় ধরনের সামরিক অভিযান' হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ইরানের সাধারণ জনগণকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ও সরকারি বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েল এই হামলাকে 'প্রতিরোধমূলক আক্রমণ' বলে দাবি করেছে। হামলার পর ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) পাল্টা হামলা শুরু করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'ট্রুথফুল প্রমিজ ৪'। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো এই পাল্টা হামলার লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সবার আগে মুখ খুলেছে জাতিসংঘ। মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সরাসরি নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এই সংঘাত আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। তিনি বলেন, "আমি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানাচ্ছি। তা না হলে এ অঞ্চলে আরও বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বেসামরিক জনগোষ্ঠী ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনবে।" নিউইয়র্কে শনিবার বিকেলেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়।
ওই জরুরি বৈঠকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে এই হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, প্রক্সি মিলিশিয়াদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হওয়া থেকে বিরত রাখাই ছিল এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। একইসঙ্গে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন বলেন, "যখন কোনো শাসকগোষ্ঠী 'ইসরায়েল ধ্বংস হোক' বা 'যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস হোক' বলে স্লোগান দেয়, তখন আমরা সেটাকে হালকাভাবে নিই না।"
ইরানের দীর্ঘদিনের বন্ধু রাশিয়া এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া সতর্ক করে বলেন, "ইরানের ওপর আজ যে আগ্রাসন চালানো হয়েছে, তার ফলে ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়ে গেছে। এ সংঘাত ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়তে পারে।" মস্কো আগে থেকেই বিশ্বকে সতর্ক করেছিল যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি নষ্ট করার যেকোনো পদক্ষেপ সবাইকে বড় মূল্য দিয়ে শোধ করতে হবে।
পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুদ্ধের আগুন জ্বলছে, তখন কূটনৈতিক টেবিলেও বড় ধাক্কা লেগেছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি মাত্র কয়েক দিন আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনার মধ্যস্থতা করছিলেন। হামলার পর তিনি 'মর্মাহত' হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, "চলমান গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আবারও ভেস্তে গেল।" তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি বলেন, "এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যও ভালো হবে না, আর বিশ্বশান্তির জন্যও না। এটি আপনাদের যুদ্ধ নয়।"
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই হামলাকে 'সম্পূর্ণ উসকানিমূলক, অবৈধ ও অন্যায্য' বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি এখন 'ইসরায়েল ফার্স্ট'-এ পরিণত হয়েছে, যার মানে দাঁড়ায় 'আমেরিকা লাস্ট'। তাঁর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
আরব বিশ্বেও প্রতিক্রিয়া দ্বিধাবিভক্ত। ইরানের পাল্টা হামলায় বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান ও কুয়েত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সৌদি আরব ইরানের এই পাল্টা হামলাকে 'নির্লজ্জ আগ্রাসন' বলে কঠোর নিন্দা জানিয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর পাশে দাঁড়াতে সৌদি আরব তার সব সক্ষমতা কাজে লাগাতে প্রস্তুত।
ইউরোপের প্রধান তিন দেশ একযোগে বিবৃতি দিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানকে 'আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ' খুঁজে নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা স্পষ্ট করেছেন, "আমরা এসব হামলায় অংশ নিইনি।" যদিও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্টারমার জানিয়েছেন, ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে মোতায়েন ছিল—তবে সেগুলো হামলায় নয়, মিত্রদের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ আগেই সতর্ক করেছিলেন, এ ধরনের উত্তেজনা 'সবার জন্যই বিপজ্জনক'। জার্মানি জানিয়েছে, হামলার আগেই তাদের জানানো হয়েছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস পরিস্থিতিকে 'বিপজ্জনক' বলে চিহ্নিত করেছেন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলাকে এই মুহূর্তের সবচেয়ে জরুরি বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির দপ্তর জানিয়েছে, উত্তেজনা কমাতে তারা মিত্র ও আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে। ব্রাজিল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই হামলার নিন্দা জানিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ জানিয়েছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে বাধা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপকে তাঁর দেশ সমর্থন করে।
সবশেষে, জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ক সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, "যেকোনো সশস্ত্র সংঘাতে সব সময় সাধারণ মানুষকেই চরম মূল্য দিতে হয়।" তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে করিয়ে দেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা চলার পর শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন বিশ্বকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে — এটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।