জামায়াত প্রসঙ্গে ফজলুর রহমানের মন্তব্যে সংসদে উত্তেজনা, ১০ মিনিট অচল অধিবেশন
ঢাকা: জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে তাঁর করা মন্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদে সরব হলে অধিবেশনকক্ষে হইচই শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রায় ১০ মিনিট আইনসভার কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
মঙ্গলবার বিকেলে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে ফজলুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি এবং জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা পরিবার বা শহীদ পরিবারের সদস্যের জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়; কেউ হলে সেটিকে তিনি “ডাবল অপরাধ” হিসেবে দেখেন। এই মন্তব্যের পরই অধিবেশনকক্ষে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ফজলুর রহমান তাঁর বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের তুলনারও বিরোধিতা করেন। তাঁর ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অন্য কোনো ঘটনার সঙ্গে এক কাতারে দেখানো ঠিক নয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই এবং এই দেশের ইতিহাসে শহীদদের আত্মত্যাগ চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
বিতর্কিত মন্তব্যের পর জামায়াত ও তাদের মিত্র রাজনৈতিক ধারার কয়েকজন সদস্য তীব্র আপত্তি জানান। তাঁরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। এর জবাবে সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এতে সংসদকক্ষে হট্টগোল আরও বেড়ে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ একাধিকবার সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংসদের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে, পুরো জাতি তা দেখছে। বিধি মেনে সংসদ পরিচালিত না হলে প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন। সদস্যদের আচরণে নতুন প্রজন্ম কী বার্তা পাবে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
হট্টগোলের মধ্যেও ফজলুর রহমান তাঁর বক্তব্য চালিয়ে যেতে চাইলে বিরোধী দলের প্রতিবাদ আরও জোরালো হয়। পরে স্পিকার তাঁকে বসতে বলেন এবং উভয় পক্ষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। এ সময় সংসদে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মন্ত্রী ও সরকারদলীয় কয়েকজন সংসদ সদস্যকেও সক্রিয় থাকতে দেখা যায়।
ঘটনার পর বিরোধীদলীয় নেতা ফ্লোর নিয়ে ফজলুর রহমানের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যা গুরুতর ও অসংসদীয়। বিতর্কিত অংশ সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানানো হয় বলেও জানা গেছে।
সংসদীয় সূত্রে জানা যায়, ফজলুর রহমান তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলছেন এবং স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান আগের মতোই অনড়। তবে তাঁর এই রাজনৈতিক মূল্যায়ন যখন সরাসরি বর্তমান বিরোধী দলের কিছু সদস্যের দিকে ইঙ্গিত করে চলে যায়, তখনই মূলত উত্তেজনা চরমে ওঠে।
সাম্প্রতিক সংসদীয় আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ পরিবার, রাজনৈতিক পরিচয় ও জামায়াতের ভূমিকা—এই কয়েকটি বিষয় নতুন করে সামনে এসেছে। মঙ্গলবারের এই ঘটনা দেখাল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এখনো বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি ইস্যু। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক কীভাবে সংসদের বিধির মধ্যে রাখা যায়, সেটিই এখন স্পিকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় পরীক্ষা।