ধাপে ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের চিন্তা

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল একবারে নয়, ধাপে ধাপে কার্যকরের সুপারিশ এসেছে। প্রাথমিকভাবে মূল বেতন বাড়িয়ে পরবর্তী সময়ে ভাতা-সুবিধা সমন্বয়ের পরিকল্পনা বিবেচনায় রয়েছে; এখন অপেক্ষা সরকারের চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্তের।

Apr 30, 2026 - 01:49
 0  2
ধাপে ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের চিন্তা

সরকারি চাকরিজীবীদের নবম পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাড়তি আর্থিক চাপ সামাল দিতে একবারে পুরো কাঠামো কার্যকর না করে পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়নের পথই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার বিষয়েও নীতিগত আলোচনা চলছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকার বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন পে-স্কেল নিয়ে সুপারিশ তৈরি করা হয়েছে। জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশন-সংক্রান্ত সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য পুনর্গঠিত কমিটি সম্প্রতি তাদের মতামত জমা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নীতিগত অনুমোদন মিললে প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে ধীরে ধীরে অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ, পুরো পে-স্কেল একসঙ্গে কার্যকর করার বদলে ধাপে বাস্তবায়নের দিকেই ঝুঁকছে সরকার।

বাংলাদেশে সর্বশেষ অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণা হয়েছিল ২০১৫ সালে। সেই হিসাবে এক দশকের বেশি সময় ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় আছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। এ প্রেক্ষাপটে নতুন পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং তা এখন অর্থনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তের বড় আলোচ্য হয়ে উঠেছে।

প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত দাঁড়ায় ১:৮। তুলনায় ২০১৫ সালের পে-স্কেলে এই অনুপাত ছিল ১:৯.৪। অর্থাৎ, নতুন কাঠামোতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবনায় ২০তম গ্রেডের একটি উদাহরণও রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা যুক্ত করে তার মোট প্রাপ্তি দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী একই গ্রেডে মূল বেতন ২০ হাজার টাকা হলে ভাতাসহ মোট প্রাপ্তি বেড়ে প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় পৌঁছাতে পারে।

শুধু নিম্ন গ্রেড নয়, ১৯তম থেকে ১ম গ্রেড পর্যন্তও বেতন ও ভাতায় পরিবর্তনের সুপারিশ রয়েছে। তবে সমতা ও যৌক্তিকতার কথা বিবেচনায় উচ্চ গ্রেডে বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম রাখা হতে পারে। কিছু ভাতা—যেমন যাতায়াত, টিফিন, ধোলাই ও ঝুঁকিভাতা—নির্দিষ্ট গ্রেড ও দায়িত্বভিত্তিকভাবে বহাল বা সমন্বিত হতে পারে বলেও প্রস্তাবে ইঙ্গিত রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে চালু থাকা ১০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ বিশেষ ভাতা নতুন কাঠামোর সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়েও সুপারিশ রাখা হয়েছে।

তবে এই পুরো প্রস্তাব বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অর্থায়ন। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে উঠে এসেছে, নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর করতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার মতো। ফলে এক ধাপে পুরো পে-স্কেল কার্যকর করলে বাজেটের ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাই ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তাকে সামনে এনেছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ সময়োপযোগী হলেও এর সঙ্গে আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গভীরভাবে যুক্ত। তাই বাস্তবায়নের আগে সরকারকে ব্যয়ের উৎস, সময়সূচি এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণে সতর্ক থাকতে হবে।

সব মিলিয়ে, নবম পে-স্কেল এখন সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—নতুন পে-স্কেল এলে সেটি সম্ভবত একবারে নয়, ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, বাজেটের সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির ওপরই নির্ভর করবে এই বেতন কাঠামো কবে এবং কীভাবে বাস্তবে রূপ পায়।

নিউজ প্রতিনিধি আমি Vknews24–এর একজন প্রতিনিধি হিসেবে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত আছি। সমসাময়িক ঘটনা, স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু, সমাজ-সংস্কৃতি এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করাই আমার মূল লক্ষ্য।