পৃথিবীর শেষ প্রান্ত কোথায়? জানুন সেই বিস্ময়কর শহরগুলোর কথা, যেখানে মানুষ আজও টিকে আছে

পৃথিবী গোলাকার হলেও মানুষের বসতির একটি সীমা আছে। দক্ষিণে আর্জেন্টিনার উশুইয়া আর উত্তরে আলাস্কার উটকিয়াগভিক—এ দুটি শহরই পরিচিত পৃথিবীর শেষ প্রান্ত নামে। কেমন সেখানকার জীবন, কীভাবে টিকে আছেন মানুষ—জেনে নিন বিস্তারিত।

May 2, 2026 - 14:51
 0  9
পৃথিবীর শেষ প্রান্ত কোথায়? জানুন সেই বিস্ময়কর শহরগুলোর কথা, যেখানে মানুষ আজও টিকে আছে

পৃথিবী গোল—এ কথা ছোটবেলার ভূগোল বইয়ে সবাই পড়েছি। তাই কেউ যদি প্রশ্ন করে, "পৃথিবীর শেষ প্রান্ত কোথায়?"—তখন উত্তর দেওয়াটা একটু কঠিনই বটে। তবে ভৌগোলিকভাবে গোল হলেও মানুষের বসতির কিন্তু একটা সীমানা আছে। সেই সীমানার শেষ মাথায় গিয়ে আজও কিছু মানুষ বসবাস করছেন প্রচণ্ড ঠান্ডা, দীর্ঘ অন্ধকার আর প্রকৃতির রুদ্রমূর্তিকে সঙ্গী করে। চলুন, আজ ঘুরে আসা যাক পৃথিবীর সেই দুই প্রান্তের শহরগুলো থেকে, যেখানে জীবনযাত্রা একেবারেই অন্যরকম।

দক্ষিণের শেষ মাথায় কী আছে?

বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, দক্ষিণ গোলার্ধের ৪৫ ডিগ্রি অক্ষাংশের পর থেকে স্থলভাগ প্রায় শেষ হয়ে আসে। এর পরে শুধু চিলি, আর্জেন্টিনা, নিউজিল্যান্ডের একদম শেষ মাথা আর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের কিছু অংশই চোখে পড়ে। বাকিটা শুধু সমুদ্র আর বরফ।

দক্ষিণ গোলার্ধে "সবচেয়ে দক্ষিণের শহর" হওয়ার লড়াইয়ে রয়েছে মূলত তিনটি নাম—চিলির পুয়ের্তো উইলিয়ামস, পুন্তা আরেনাস এবং আর্জেন্টিনার উশুইয়া।

পুয়ের্তো উইলিয়ামস ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে দক্ষিণে অবস্থিত হলেও এর জনসংখ্যা মাত্র দুই হাজারের কাছাকাছি। তাই অনেকেই একে পূর্ণাঙ্গ "শহর" হিসেবে মানতে রাজি হন না। অন্যদিকে পুন্তা আরেনাস বড় শহর হলেও পুয়ের্তো উইলিয়ামস থেকে প্রায় দুইশ কিলোমিটার উত্তরে।

উশুইয়া—সত্যিকারের 'ফিন দেল মুন্দো'

সব দিক বিবেচনায় "পৃথিবীর শেষ প্রান্তের শহর" হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে আর্জেন্টিনার উশুইয়া। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় "ফিন দেল মুন্দো"—অর্থাৎ পৃথিবীর শেষ মাথা। টিয়েরা দেল ফুয়েগো প্রদেশের এই শহরে বর্তমানে প্রায় ৮২ হাজারের বেশি মানুষের বাস।

পাহাড়, বরফ আর সমুদ্রের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়া উশুইয়া এখন বিশ্ব পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। আধুনিক রাস্তাঘাট, রেস্তোরাঁ, হোটেল আর কোলাহলপূর্ণ বন্দর—সব মিলিয়ে এটি একটি জমজমাট শহর। যাঁরা অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে যেতে চান, তাঁদের অধিকাংশ অভিযানের জাহাজ ছাড়ে এই উশুইয়া বন্দর থেকেই। শহরের আশপাশে পেঙ্গুইনের ঝাঁক আর তুষারে ঢাকা পাহাড় পর্যটকদের চোখ ফেরাতে দেয় না।

এবার চলুন উত্তরের প্রান্তে

মজার ব্যাপার হলো, উশুইয়া যে অক্ষাংশে অবস্থিত, ঠিক একই অক্ষাংশে উত্তর গোলার্ধে গেলে আপনি পৌঁছে যাবেন ইংল্যান্ডের কোনো ছিমছাম শহরে! কারণ উত্তর গোলার্ধে স্থলভাগ অনেক বেশি, আর সমুদ্রের উষ্ণ স্রোতের কারণে আবহাওয়াও অপেক্ষাকৃত সহনীয়। তাই উত্তরের শেষ প্রান্ত খুঁজতে হলে আরও অনেক দূর যেতে হবে।

কানাডার নুনাভুট অঞ্চলে রয়েছে "অ্যালার্ট" নামে একটি জনবসতি, যা কারিগরিভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের স্থায়ী বসতি। তবে সেখানে সাধারণ মানুষ থাকেন না—মূলত সামরিক বাহিনীর সদস্য আর গবেষকেরাই কাজের প্রয়োজনে কিছুদিনের জন্য থাকেন। ফলে একে শহর বলা যায় না।

লংইয়ারবাইন—যেখানে মেরুভালুক বেশি, মানুষ কম

নরওয়ের স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত লংইয়ারবাইন পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের জনবহুল জায়গাগুলোর একটি। এখানকার নিয়মকানুন রীতিমতো অবাক করার মতো।

বলা হয়, এই অঞ্চলে মানুষের চেয়ে মেরুভালুকের সংখ্যা বেশি। তাই শহরের সীমানার বাইরে গেলে আত্মরক্ষার জন্য বন্দুক বহন করা বাধ্যতামূলক। এর চেয়েও অদ্ভুত আরেকটি নিয়ম—এই শহরে কাউকে কবর দেওয়া নিষিদ্ধ! কারণ তীব্র ঠান্ডার কারণে মৃতদেহ মাটির নিচে পচে না, বরং অক্ষত থেকে যায়। প্রায় ২ হাজার ৮০০ মানুষ এখানে বাস করেন। আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকলেও প্রশাসনিক সংজ্ঞায় একে পুরোপুরি "শহর" বলা যায় না।

উটকিয়াগভিক—আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের শহর

আইনগত স্বীকৃতির ভিত্তিতে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের শহরের তকমাটি পেয়েছে আমেরিকার আলাস্কার একটি জনপদ—উটকিয়াগভিক। আগে এর নাম ছিল ব্যারো। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বাস এই শহরে। সুমেরু বৃত্তের অনেক ওপরে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার জীবন কঠিন এবং চ্যালেঞ্জে ভরা।

উটকিয়াগভিকের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো দিন-রাতের অদ্ভুত খেলা। শীতকালে টানা প্রায় ৬৫ দিন সূর্যের দেখা মেলে না। একে বলা হয় "পোলার নাইট"—অর্থাৎ মেরু রাত। দিনের পর দিন পুরো শহর ডুবে থাকে অন্ধকারে। ঠিক উল্টোভাবে গ্রীষ্মকালে প্রায় আড়াই মাস ধরে সূর্য কখনো অস্ত যায় না। মাঝরাতেও আকাশে জ্বলজ্বল করে সূর্য, যা "মিডনাইট সান" নামে পরিচিত।

কঠিন প্রকৃতিতেও টিকে থাকার গল্প

এই চরম পরিবেশে হাজার হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছেন ইনুপিয়াত আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। তীব্র ঠান্ডা, দীর্ঘ অন্ধকার আর সীমিত খাদ্যসম্ভার—সব কিছুকে মোকাবিলা করেই তাঁরা টিকে আছেন। তিমি শিকার তাঁদের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা। এখনো পরিবার ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সংস্কৃতি ধরে রেখেছেন তাঁরা, যা আধুনিক বিশ্বে এক বিরল উদাহরণ।

দক্ষিণে উশুইয়াতেও জীবন সহজ নয়। দীর্ঘ শীতকাল, ঝোড়ো বাতাস আর বছরের অধিকাংশ সময় ঠান্ডার কারণে স্থানীয় মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করেই দিন কাটাতে হয়। তবে পর্যটনশিল্প এই শহরের অর্থনীতিকে যথেষ্ট সমৃদ্ধ করেছে।

এক মজার মিল

এক চমৎকার তথ্য না বললেই নয়—পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণের শহর উশুইয়া এবং সবচেয়ে উত্তরের শহর উটকিয়াগভিক—দুটিই অবস্থিত আমেরিকা মহাদেশে। অর্থাৎ, পৃথিবীর "এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত" পর্যন্ত পাড়ি দিতে চাইলে তাত্ত্বিকভাবে আপনাকে কেবল একটি মহাদেশের ভেতর দিয়েই যেতে হবে।

শেষ কথা

পৃথিবীর শেষ প্রান্ত আসলে কোনো এক বিন্দু নয়—এটি মানুষের সাহস, সহনশীলতা আর অভিযোজন ক্ষমতার এক জীবন্ত প্রমাণ। যেখানে বছরের অর্ধেক সময় সূর্য ওঠে না, যেখানে মেরুভালুকের ভয়ে বন্দুক নিয়ে বের হতে হয়, সেখানেও মানুষ ঘর বেঁধেছে, সংসার করেছে, সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। উশুইয়া কিংবা উটকিয়াগভিক—এই দুই শহর শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের চিরন্তন সহাবস্থানের প্রতীক। প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, পৃথিবীর শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালে আজও বোঝা যায়—মানুষ আসলে কতটা ক্ষুদ্র, আবার কতটা অদম্য।

নিউজ প্রতিনিধি আমি Vknews24–এর একজন প্রতিনিধি হিসেবে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত আছি। সমসাময়িক ঘটনা, স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু, সমাজ-সংস্কৃতি এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করাই আমার মূল লক্ষ্য।