তেলের দাম ব্যারেলে ৭৬ ডলার ছাড়াল! হরমুজ প্রণালি বন্ধে ওয়ালস্ট্রিটে পতনের আভাস

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি অবরোধের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে ৪.৮৪%। ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেলে ৭৬.৪০ ডলার ছাড়িয়েছে। ওয়ালস্ট্রিট ও ইউরোপের শেয়ারবাজারে পতনের আভাস।

Mar 2, 2026 - 05:31
 0  5
তেলের দাম ব্যারেলে ৭৬ ডলার ছাড়াল! হরমুজ প্রণালি বন্ধে ওয়ালস্ট্রিটে পতনের আভাস

বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। কারণটা হলো মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের উত্তাপ এখন ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্রে — বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে। আর এই একটি কারণেই পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে আজ সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪.৮৪ শতাংশ বেড়ে ৭৬.৪০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে আমেরিকার বাজারে ডব্লিউটিআই ক্রুড তেলের দাম ৪.৪৩ শতাংশ বেড়ে ৬৯.৯৯ ডলারে উঠে এসেছে। এশিয়ার বাজারে সকালে একপর্যায়ে দাম ১০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গিয়েছিল, যদিও পরে কিছুটা কমে আসে। খবর বিবিসিঅয়েল প্রাইস ডটকম-এর।

পরিস্থিতি এতটা ঘোলাটে হওয়ার পেছনে সরাসরি কারণ হলো হরমুজ প্রণালির কাছে অন্তত তিনটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। যুক্তরাজ্যের সরকারি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও (UKMTO) জানিয়েছে, দুটি জাহাজে সরাসরি আঘাত লেগে আগুন ধরে গেছে এবং তৃতীয় একটি জাহাজের খুব কাছে বিস্ফোরণ হয়েছে। একটি চতুর্থ জাহাজ থেকেও নাবিকদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী তিনটি ট্যাংকারে তারা এই হামলা চালিয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। ইরান এই প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ না যেতে হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। জাহাজ-তথ্য বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম কেপলার-এর তথ্য বলছে, অন্তত ১৫০টি তেলের ট্যাংকার এখন হরমুজের বাইরে নিরাপদ পানিতে নোঙর ফেলে অপেক্ষা করছে। শুধু ইরান ও চীনের কিছু জাহাজ এই প্রণালি পার হচ্ছে।

কেপলারের বিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহি বলেন, ইরানের হুমকি ও বিমার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, যদি পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ডেনমার্কভিত্তিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিপিং কোম্পানি মেয়ার্সক ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে, তারা সাময়িকভাবে বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখবে এবং বিকল্প হিসেবে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে পণ্য পরিবহন করবে।

এই সংকটের প্রভাব পড়েছে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিটেওসিএনএন-এর খবর অনুযায়ী, এসঅ্যান্ডপি ৫০০, নাসডাক কম্পোজিট ও ডাও জোনস-সহ ওয়ালস্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলোর ফিউচার প্রায় ১ শতাংশ করে কমে গেছে। ইউরোপেও একই ছবি। ইউরোস্টক্স ৫০ ফিউচারস কমেছে ১.৪ শতাংশ এবং জার্মানির ড্যাক্স ফিউচারস কমেছে ১.৩ শতাংশ। তবে ব্যতিক্রম হলো তেল কোম্পানিগুলো — এক্সন মবিল ও শেভরন-সহ জ্বালানি খাতের শেয়ারের আগাম দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে হামলার প্রভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত 'বিশেষ পরিস্থিতির' কথা উল্লেখ করে সাময়িকভাবে তাদের শেয়ারবাজারে লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে। গত শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরান ও ইসরায়েল নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় জড়িয়ে পড়ে। দুবাই, দোহা, বাহরাইন ও কুয়েতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।

পরিস্থিতি সামলাতে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক (OPEC) ও তার সহযোগী দেশগুলো দৈনিক ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল বাড়তি তেল উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে বড় কোনো স্বস্তি নাও আসতে পারে। এমএসটি রিসার্চ-এর জ্বালানি গবেষণা প্রধান সাউল কাভনিক মনে করেন, এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই সরাসরি তেল উৎপাদন অবকাঠামোতে হামলা করেনি। তাই বাজারে এখনো বড় আতঙ্ক তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে তেলের দাম আবার কমে আসতে পারে।

সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই আঞ্চলিক অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে। সংঘাত যদি আরও দীর্ঘ হয় এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকে, তাহলে শুধু তেলের দামই নয়, সারা বিশ্বের পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে — যা বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

নিউজ প্রতিনিধি আমি Vknews24–এর একজন প্রতিনিধি হিসেবে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত আছি। সমসাময়িক ঘটনা, স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু, সমাজ-সংস্কৃতি এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করাই আমার মূল লক্ষ্য।