খামেনি নিহতের পর মসজিদে 'লাল পতাকা': ইরানের প্রতিশোধের বার্তা কি যুদ্ধের ইঙ্গিত?
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের কোম শহরের জামকারান মসজিদে 'প্রতিশোধের লাল পতাকা' উত্তোলন করা হয়েছে। শিয়া ঐতিহ্যে এই লাল পতাকার অর্থ কী এবং এটি কি নতুন যুদ্ধের সংকেত?
মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই ইরানের কেন্দ্রীয় ধর্মীয় শহর কোমের বিখ্যাত জামকারান মসজিদের গম্বুজের উপরে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এই একটি পদক্ষেপই গোটা বিশ্বকে নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
ইরানি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ প্রায় শতাধিক মানুষ নিহত হন। রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভি আনুষ্ঠানিকভাবে খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। এরপরই দেশটি জুড়ে শোক ও ক্ষোভের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে।
খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই কোমের জামকারান মসজিদের গম্বুজে লাল পতাকা তুলে দেওয়া হয়। উত্তোলন অনুষ্ঠানে মসজিদের কর্মকর্তা ও ধর্মগুরুরা খামেনির প্রতিকৃতি বহন করে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বলে জানা গেছে। হযরত মাসুমেহ মাজারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্লোগানও দেওয়া হয়।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে — এই লাল পতাকার অর্থ আসলে কী? ইরানের রাষ্ট্র পরিচালিত প্রেস টিভি জানিয়েছে, "এই লাল পতাকাটি ইসলামী বিপ্লবের নেতার রক্তপাতের প্রতিশোধের প্রতীক।" শিয়া মুসলিম ঐতিহ্যে লাল পতাকা সাধারণত তখনই উত্তোলন করা হয় যখন কোনো নিরপরাধ মানুষ বা ধর্মীয় নেতাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়। এটি একটি শক্তিশালী বার্তা — "এই রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া হবে।" সহজ ভাষায় বললে, এই পতাকা মানে হলো 'আমরা চুপ করে বসে থাকব না।'
এটি প্রথমবার নয় যে জামকারান মসজিদে লাল পতাকা উড়েছে। এর আগে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পরেও এই একই মসজিদে লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। সেবার ওই পতাকা উত্তোলনের পর ইরান ইরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। তাই এবারও এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ খামেনির মৃত্যুর পরপরই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে এবং ইসরায়েলেও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এদিকে তেহরান ও ইসফাহানসহ বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ শোকে মুহ্যমান হয়ে রাস্তায় নেমেছেন। ইরাকের বাগদাদেও বিপুল মানুষ জড়ো হয়ে শোক প্রকাশ করেছেন। ভারতের দিল্লিতে ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সামনে এবং কাশ্মীরে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক সদর দফতরের সামনেও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে।
এদিকে, ইরান একটি তিন সদস্যের নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করেছে, যা নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করবে। এই পরিষদে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একজন ৬৬ বছর বয়সী ধর্মগুরুকে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরানের আহমাদিনেজাদসহ আরও বেশ কয়েকজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাও এই হামলায় নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামকারান মসজিদে লাল পতাকা উত্তোলন শুধু একটি আবেগের প্রকাশ নয়, এটি একটি কৌশলগত বার্তা। এই বার্তা পরিষ্কার — ইরান তার সর্বোচ্চ নেতার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই মুহূর্তে যা ঘটছে, তা গোটা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা সংঘাত নতুন এক ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাই বিশ্ব এখন উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে।