নতুন দুই মেট্রোরেলের ব্যয় আগের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি: কেন এত খরচ?

ঢাকার নতুন দুই মেট্রোরেল লাইনে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হবে ৩,৬১৮ কোটি টাকা, যা উত্তরা-মতিঝিল লাইনের দ্বিগুণের বেশি। জানুন কারণ ও প্রভাব।

Feb 22, 2026 - 06:20
 0  7
নতুন দুই মেট্রোরেলের ব্যয় আগের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি: কেন এত খরচ?

ঢাকা: রাজধানী ঢাকায় নতুন দুটি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণে যে বিপুল ব্যয় দাঁড়াচ্ছে, তা অনেকের জন্য বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে যেখানে খরচ হয়েছে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, সেখানে নতুন দুই পথে খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রতি কিলোমিটারে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, খরচ হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণের বেশি। যদিও এই বিপুল অংকের ব্যয়ে মেট্রোরেল নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকার এখনো নেয়নি।

উত্তরা থেকে মতিঝিল মেট্রোরেল লাইন-৬ এর ঠিকাদার নিয়োগ শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। সেই সময় আরও পাঁচটি পথে মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। এর মধ্যে দুটি পথে এখন নির্মাণকাজ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। একটি হলো কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এবং নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত, যার নাম এমআরটি লাইন-১। এটির দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটারের বেশি। অন্যটি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে মিরপুর এবং গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)। এটির দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটারের মতো। দুটি মেট্রোরেল লাইনেরই কিছু অংশ উড়াল এবং কিছু অংশ পাতালপথে নির্মাণ করা হবে।

নতুন দুই মেট্রোরেল পথে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই বিপুল ব্যয় মেট্রোরেল নির্মাণকেই অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। রাজধানীতে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, এত বেশি খরচে মেট্রোরেল নির্মাণ করা হলে যাত্রীদের ওপর ভাড়ার চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারের ঋণের বোঝাও বেড়ে যাবে অনেকখানি।

বিপুল ব্যয়ে মেট্রোরেল নির্মাণের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এখন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের ওপর এই সিদ্ধান্তের ভার পড়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মেট্রোরেল নির্মাণে এত বেশি ব্যয়ের মূল কারণ হলো দরপত্রে প্রতিযোগিতার সুযোগ কম থাকা। এখন প্রতিযোগিতা হচ্ছে শুধুমাত্র জাপানি ঠিকাদারদের মধ্যে। প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারলেই খরচ কমবে বলে মনে করছেন তারা।

ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন, দুটি প্রকল্পের অর্থায়নে জাপানি ঋণদাতা সংস্থা জাইকা বেশ কিছু প্রকৌশলগত শর্ত জুড়ে দিয়েছে। ফলে ঠিকাদার নিয়োগে প্রতিযোগিতা কমে গেছে। এই কারণেই ব্যয় অত্যন্ত বেশি হচ্ছে। উল্লেখ্য, মেট্রোরেল নির্মাণে ঋণ দিচ্ছে জাপান। দেশটির উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার ঋণে এমন শর্ত দেওয়া হয়, যেখানে জাপানি কোম্পানিগুলো ঠিকাদারি কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে।

ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি প্যাকেজে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাব আসায় সেখানে যোগসাজশের সন্দেহ করা হচ্ছে। এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। সরকারি প্রাক্কলনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। কিন্তু ঠিকাদারের দরপত্র অনুযায়ী এখন ব্যয় দাঁড়াবে ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা

অন্যদিকে লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালের অক্টোবরে। এর জন্য প্রাথমিকভাবে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। কিন্তু ঠিকাদারদের দর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যয় দাঁড়াবে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। উত্তরা-মতিঝিল পথের চেয়ে নতুন দুই পথে সরকার ব্যয় অনেকটা বাড়িয়ে ধরলেও ঠিকাদারের প্রস্তাব এসেছে আরও বেশি।

মজার ব্যাপার হলো, ১৩টি প্যাকেজের মধ্যে তিনটি প্যাকেজে সরকারের প্রাক্কলনের চেয়ে ঠিকাদার কয়েক গুণ বেশি ব্যয় প্রস্তাব করায় তা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দরপত্র বাতিল ও গ্রহণ সব ক্ষেত্রেই অর্থায়নকারী সংস্থা জাইকার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। দুটি প্যাকেজ বাতিলের অনুমোদন চেয়ে চিঠি দেওয়ার পর জাইকা বরং বেশি দামেই ঠিকাদার নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে।

ডিএমটিসিএলের পক্ষ থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে শুধু প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ভারতে ব্যয় হয় ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা। ভারতও বিদেশি ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, কিন্তু ঋণে এমন কোনো শর্ত তারা মানে না, যা ঠিকাদার নিয়োগের প্রতিযোগিতা ক্ষুণ্ন করে।

জাইকা এ বিষয়ে জানিয়েছে, দুটি প্রকল্পের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি তারা জানে। তবে জাইকার ক্রয়সংক্রান্ত নির্দেশিকা অনুযায়ী দরপত্র খোলার পর থেকে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো তথ্য বাইরে প্রকাশ করা যায় না। এই কারণে এই মুহূর্তে দরপত্র মূল্যায়নের নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে মন্তব্য করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

জাইকা আরও বলেছে, এমআরটি নির্মাণ ব্যয় নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণের পর থেকে মুদ্রার মানের উল্লেখযোগ্য পতন বিবেচনায় নিতে হয়। বিশ্ববাজারে দামের পরিবর্তন এবং বিনিময় হার ওঠানামার কারণে প্রকল্প ব্যয় বাড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যাত্রীচাহিদা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে এমআরটি প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক থাকতে পারে বলে তাদের দাবি।

প্রসঙ্গত, ঢাকার উত্তরা থেকে মতিঝিল পথে চলাচলকারী মেট্রোরেল থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। তবে ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ঋণের কিস্তি হিসেবে ৪৬৫ কোটি থেকে ৭৪০ কোটি টাকা দিতে হবে। এই পরিস্থিতিতে নতুন মেট্রোরেল লাইনের বিপুল ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এটা নিশ্চিত যে সেখানে প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। এই কারণেই বিপুল ব্যয়ের বোঝা চাপছে। এই ব্যয়ে মেগা প্রকল্প করলে বাংলাদেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

প্রতিযোগিতার ঘাটতি বিষয়ে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) এর একটি প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগে চূড়ান্ত দরপত্র উন্মুক্ত করা হয় গত ৯ ডিসেম্বর। এর আওতায় মিরপুর থেকে কচুক্ষেত পর্যন্ত মাটির নিচ দিয়ে মেট্রোরেলের পথ ও স্টেশন নির্মাণ করা হবে। দেখা যায়, ১১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে জাপানের শিমুজি করপোরেশন এর নেতৃত্বে একটি কনসোর্টিয়াম। এই কাজের জন্য সরকার ব্যয় প্রাক্কলন করেছিল ৩ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ঠিকাদার দর প্রস্তাব করেছে ২৯৫ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি

আরও আগে গত বছরের ১৮ জুন কচুক্ষেত থেকে ভাটারা পর্যন্ত মেট্রোরেলের পথ ও স্টেশন নির্মাণের জন্য একটি দরপত্র খোলা হয়। এতে দেখা যায়, ১৫ হাজার ৫২৭ কোটি টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে জাপানের তাইসি ও দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং এর যৌথ উদ্যোগ। এই অংশের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ঠিকাদারের দর ৩৯১ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। জাইকার শর্তানুযায়ী, ঠিকাদারের প্রস্তাবিত দরে কোনো ভুল না থাকলে এই দুই কনসোর্টিয়াম নিয়োগ পাওয়ার কথা। কিন্তু ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ এই দরপত্র গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি প্যাকেজেই দরপত্র প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রাথমিকভাবে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান দরপত্র সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত দরপত্র জমা দেয়। এই দুটি হলো শিমুজি করপোরেশন এবং তাইসি-স্যামসাং কনসোর্টিয়াম। মজার ব্যাপার হলো, একটি প্যাকেজে শিমুজি সর্বনিম্ন দরদাতা হলে অন্যটিতে তাইসি-স্যামসাং সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএমটিসিএলের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, জাপানি ঋণ এবং দরপত্রের শর্ত এমনভাবে তৈরি করা যে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধা পায়। কিন্তু এভাবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগাভাগি করে কাজ পাওয়ার বিষয়টি যোগসাজশ ছাড়া সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণের করের টাকায় অতিরিক্ত বোঝা চাপছে।

বর্তমানে রাজধানীর যানজট সমস্যা সমাধানে মেট্রোরেল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এত বিপুল ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তা দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। একইসঙ্গে যাত্রীদের জন্য টিকিটের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না। এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে খরচ কমিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দরপত্রে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং জাপানি ঠিকাদারদের একচেটিয়া ব্যবসা ভেঙে অন্য দেশের ঠিকাদারদেরও সুযোগ দিতে হবে। তাহলেই খরচ কমানো সম্ভব হবে।

এদিকে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নে মেট্রোরেল প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নতুন সরকার এখন সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া হবে। জনস্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি উভয় বিবেচনায় নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

নিউজ প্রতিনিধি আমি Vknews24–এর একজন প্রতিনিধি হিসেবে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত আছি। সমসাময়িক ঘটনা, স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু, সমাজ-সংস্কৃতি এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করাই আমার মূল লক্ষ্য।