শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে যেসব অত্যাধুনিক সুবিধা থাকছে | নতুন টার্মিনাল ২০২৬
শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে ৩৭টি এয়ারক্রাফট পার্কিং, ২৬টি বোর্ডিং ব্রিজ, স্বয়ংক্রিয় চেকইন সুবিধাসহ আরও অনেক আধুনিক সেবা থাকছে। জানুন বিস্তারিত।
রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই অত্যাধুনিক টার্মিনাল শিগগিরই চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন। দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই বিশাল টার্মিনালটি বর্তমান দুটি টার্মিনালের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বড় হবে। যাত্রীদের জন্য কী কী নতুন সুবিধা থাকছে এই থার্ড টার্মিনালে, জেনে নিন বিস্তারিত।
শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পটি ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর একনেকে অনুমোদন পায়। প্রথমে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও পরে আরও ৭ হাজার ৭৮৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বাড়িয়ে প্রকল্পের মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। এই বিশাল প্রকল্পের বেশিরভাগ অর্থ এসেছে জাপানের সহযোগিতা সংস্থা জাইকার কাছ থেকে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর জাপানের মিৎসুবিশি, ফুজিটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং মিলে ঢাকা কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে এই মেগা প্রকল্পের কাজ করছে।
বিমান পার্কিং এবং ট্যাক্সিওয়ে সুবিধা নিয়ে কথা বললে, নতুন টার্মিনালে মোট ৩৭টি অ্যাপ্রোন পার্কিং থাকবে। এর মানে হলো একসঙ্গে ৩৭টি বিমান পার্ক করা যাবে এই টার্মিনালে। বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরে চারটি ট্যাক্সিওয়ে থাকলেও নতুন টার্মিনালের সঙ্গে আরও দুটি হাই স্পিড ট্যাক্সিওয়ে যুক্ত হবে। এতে বিমান ওঠানামায় সময় কমবে এবং যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা থেকে মুক্তি মিলবে।
বোর্ডিং ব্রিজ এবং পার্কিং বে সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, থার্ড টার্মিনালে থাকবে ২৬টি অত্যাধুনিক বোর্ডিং ব্রিজ। তবে প্রথম পর্যায়ে চালু করা হবে ১২টি বোর্ডিং ব্রিজ। এছাড়া উড়োজাহাজ রাখার জন্য থাকছে ৩৬টি পার্কিং বে। এই সুবিধাগুলো যাত্রীদের বিমানে ওঠা-নামার সময় আরও স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
চেকইন কাউন্টার এবং স্বয়ংক্রিয় সেবা পেতে যাত্রীদের আর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। বহির্গমন যাত্রীদের জন্য থার্ড টার্মিনালে থাকছে মোট ১১৫টি চেকইন কাউন্টার। এর মধ্যে ১৫টি হবে সেলফ সার্ভিস বা স্বয়ংক্রিয় চেকইন কাউন্টার। যাত্রীরা নিজেরাই মেশিনের মাধ্যমে দ্রুত চেকইন সম্পন্ন করতে পারবেন। এতে সময় বাঁচবে এবং ভিড় কমবে।
ইমিগ্রেশন এবং পাসপোর্ট কন্ট্রোল সেবায় আসছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। বহির্গমন যাত্রীদের জন্য থাকছে ৬৬টি ডিপারচার ইমিগ্রেশন কাউন্টার। এর মধ্যে ১০টি হবে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট কন্ট্রোল কাউন্টার। আগমন যাত্রীদের জন্যও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। মোট ৫৯টি পাসপোর্ট কন্ট্রোল কাউন্টার থাকবে, যার মধ্যে পাঁচটি হবে স্বয়ংক্রিয়। এছাড়া ১৯টি চেকইন অ্যারাইভাল কাউন্টার যুক্ত হচ্ছে।
ব্যাগেজ সংগ্রহ ব্যবস্থা হবে আরও দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত। নতুন টার্মিনালে ১৬টি আগমনী ব্যাগেজ বেল্ট স্থাপন করা হবে। এতে যাত্রীরা অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মালপত্র সংগ্রহ করতে পারবেন। এই আধুনিক ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম আন্তর্জাতিক মানের হবে।
গাড়ি পার্কিং সুবিধা নিয়েও রয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। থার্ড টার্মিনালের সঙ্গে নির্মাণ করা হচ্ছে একটি মাল্টিলেভেল কার পার্কিং ভবন। এই অত্যাধুনিক পার্কিং ভবনে একসঙ্গে এক হাজার ৩৫০টি গাড়ি পার্ক করার ব্যবস্থা থাকবে। যাত্রী আনা-নেওয়ার সময় গাড়ি পার্কিং নিয়ে আর কোনো সমস্যা হবে না।
থার্ড টার্মিনালের মোট আয়তন দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার, যা বর্তমান দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত আয়তন এক লাখ বর্গমিটারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। এই বিশাল টার্মিনালে একসঙ্গে লাখো যাত্রী সেবা নিতে পারবেন। বিমানবন্দরের যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়বে বহুগুণ।
শাহজালাল বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল চালু হলে বাংলাদেশের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসবে নতুন মাত্রা। আন্তর্জাতিক মানের এই টার্মিনাল দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। প্রযুক্তি নির্ভর স্বয়ংক্রিয় সেবা, প্রশস্ত জায়গা এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যাত্রীদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা করবে সহজ ও আরামদায়ক। ২০২৪ সালের এপ্রিলে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিলম্বের পর এখন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শিগগিরই এই অত্যাধুনিক টার্মিনাল যাত্রীদের সেবায় খুলে দেওয়া হবে।
দেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের এই বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আসবে নতুন গতি। শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল হবে বাংলাদেশের উন্নয়নের আরেকটি মাইলফলক।