হরমুজ প্রণালীতে ইরানের হামলা: ৩ জাহাজে আগুন, তেলের দাম বাড়ল ৯%
প্রণালীর কাছে ইরানের হামলায় ৩টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত, বিশ্ব তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা। ব্রেন্ট ক্রুড ৯% বেড়ে ৭৯.৫০ ডলারে পৌঁছেছে। পুরো ঘটনা জানুন।
হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের হামলায় তিনটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিশ্বের তেলের বাজারে তীব্র অস্থিরতা শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের মাঝেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে এমন ঘটনা ঘটল। খবরটি দিয়েছে বিবিসি।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার জানিয়েছে, দুটি জাহাজে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে এবং তৃতীয় একটি জাহাজের একেবারে কাছে একটি "অজানা প্রজেক্টাইল" বা ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরিত হয়েছে। এর আগে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) দাবি করেছিল যে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার "ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জ্বলছে"। তবে এই দাবির বিষয়ে যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি।
বেসরকারি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা 'ভ্যানগার্ড টেক' জানিয়েছে, জিব্রাল্টার, পালাউ, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী জাহাজগুলো এই হামলার শিকার হয়েছে। এছাড়া চতুর্থ একটি জাহাজ থেকে ক্রুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। তৃতীয় জাহাজটির ক্রুরা এখনও সুস্থ ও নিরাপদ আছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইরান ইতিমধ্যে কঠোর সতর্কতা জারি করে বলেছে, কোনো বিদেশি জাহাজ যেন হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল না করে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই একটিমাত্র পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইরানের এই হুমকির কারণে প্রণালীতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
জাহাজ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম 'কিপলার'-এর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৫০টি তেলের ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালীর বাইরে খোলা সমুদ্রে নোঙর ফেলে অপেক্ষা করছে। কিপলারের বিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহি বিবিসি নিউজকে বলেছেন, "ইরানের হুমকির কারণে প্রণালীটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। জাহাজগুলো পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সেখানে প্রবেশ করছে না, কারণ ঝুঁকি অনেক বেশি এবং বীমা খরচ আকাশচুম্বী হয়ে গেছে।" তিনি আরও সতর্ক করেন, প্রণালীটি দীর্ঘকাল বন্ধ থাকলে তেলের দাম "আরও অনেক বেশি" বেড়ে যেতে পারে।
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বের তেলের বাজারে। সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার সাথে সাথেই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৯ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯.৫০ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে মার্কিন ক্রুড অয়েলের দাম ৮.৪ শতাংশ বেড়ে ৭২.৬৬ ডলারে উঠে আসে। বাজার বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এদিকে ডেনিশ শিপিং জায়ান্ট মায়েরস্ক রবিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালী এবং সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখছে এবং জাহাজগুলোকে আফ্রিকার 'কেপ অফ গুড হোপ' হয়ে দীর্ঘ পথে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এতে পরিবহন সময় ও খরচ উভয়ই বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে বিশ্ব বাণিজ্যে।
পরিস্থিতি সামলাতে সৌদি আরব ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন ওপেক প্লাস (OPEC+) গ্রুপ প্রতিদিন অতিরিক্ত ২,০৬,০০০ ব্যারেল তেল উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ বাজারের বর্তমান অস্থিরতা রোধে খুব একটা কার্যকর হবে না।
ব্রিটিশ অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এডমন্ড কিং বলেছেন, "মধ্যপ্রাচ্যে এই অস্থিরতা ও বোমাবর্ষণ বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করবে এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি অনিবার্য। তবে দাম কতটা বাড়বে এবং কতদিন বাড়তি থাকবে, তা নির্ভর করছে সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর।"
এই ঘটনার পটভূমিতে রয়েছে গত শনিবার মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর নিহত হওয়ার ঘটনা। এরপর রবিবার ইরান ও ইসরায়েল পরস্পরের বিরুদ্ধে নতুন করে বিমান হামলা চালায়। এর পাশাপাশি দুবাই, কাতার, বাহরাইন এবং কুয়েত-এও হামলার খবর আসে, যা মধ্যপ্রাচ্যের পুরো অঞ্চলকে একটি ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয় এবং হরমুজ প্রণালী কতদিনে স্বাভাবিক হয়, সেদিকেই এখন গোটা বিশ্বের নজর।