ইরান ‘ভেঙে পড়ছে’, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ: ট্রাম্পের দাবি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এখন এমন এক দুর্বল অবস্থায় পৌঁছেছে যে দেশটি হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরান নেতৃত্ব–সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ আবার চালু করতে আগ্রহী। তবে ইরান কীভাবে এই বার্তা ওয়াশিংটনকে দিয়েছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প পরিষ্কার কিছু বলেননি; তেহরানের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরান নিজেদের প্রায় ভেঙে পড়া অবস্থায় আছে বলে জানিয়েছে এবং যত দ্রুত সম্ভব হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়টি চায়। তাঁর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই মাসের সংঘাত ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে, আর যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে জ্বালানি সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় চাপ তৈরি করেছে।
এর আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরান চাইলে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। গত ২৬ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, আলোচনা এগিয়ে নিতে তেহরান চাইলে ফোনও করতে পারে। কিন্তু একই সময়ে ইরান জানায়, চাপ, হুমকি ও নৌ-অবরোধের মধ্যে তারা কোনো চাপিয়ে দেওয়া আলোচনায় বসবে না। এতে স্পষ্ট হয়, দুই পক্ষই আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করছে না, কিন্তু পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো কাটেনি।
কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তান, ওমান এবং পরে রাশিয়ায় দৌড়ঝাঁপ করেন। রয়টার্সের তথ্যমতে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন একটি প্রস্তাব পাঠায়, যাতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা, যুদ্ধ বন্ধ করা এবং পারমাণবিক আলোচনা পরে করার কথা ছিল। যদিও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তখনই এ প্রস্তাব গ্রহণের কোনো ইঙ্গিত মেলেনি।
ট্রাম্পের অবস্থানও বেশ কঠোর। ২৪ এপ্রিল রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যে কোনো সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগের প্রশ্ন এবং হরমুজ দিয়ে তেল চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে শুধু যুদ্ধ থামানোই নয়, বরং জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ—দুইটিই একই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে এত উদ্বেগের কারণও স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় তেল রপ্তানির বড় অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়। রয়টার্সের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করে। ফলে এখানে অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু উপসাগরীয় অঞ্চল নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, শিপিং খরচ এবং আমদানি–নির্ভর অর্থনীতিগুলোও দ্রুত চাপে পড়ে।
এ কারণেই হরমুজ প্রশ্নটি এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের সামরিক বা কূটনৈতিক ইস্যু নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিরও একটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। আলোচনা থমকে যাওয়ার খবরেই তেলের দাম বেড়েছে, ডলারের অবস্থান শক্ত হয়েছে এবং বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানের বাইরে, অর্থনীতির ভাষায়ও এই সংকটের অভিঘাত এখন স্পষ্ট।
তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ দাবির একটি বড় সীমাবদ্ধতা আছে—এটি এখনো একতরফা বক্তব্য। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি যে তারা “ভেঙে পড়েছে” বা যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ খুলে দিতে অনুরোধ করেছে। ফলে রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে ট্রাম্প এই ভাষা ব্যবহার করেছেন কি না, সেটিও পর্যবেক্ষকদের নজরে রয়েছে। বিশেষ করে এর আগেও তিনি ইরানের নেতৃত্বে বিভ্রান্তি ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কথা বলেছিলেন, কিন্তু সেসব দাবির স্বতন্ত্র নিশ্চয়তা সব সময় পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে আছে, যেখানে যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা, পারমাণবিক ইস্যু এবং আঞ্চলিক কূটনীতি—সবকিছু এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেছে। ট্রাম্পের দাবি সত্য হোক বা কৌশলগত বার্তা—হরমুজ প্রণালি যে এখনো বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির এক অত্যন্ত সংবেদনশীল কেন্দ্র, তা আবারও স্পষ্ট হলো। সামনে ইরানের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপই বলে দেবে, এই উত্তেজনা নতুন আলোচনায় গড়াবে, নাকি আরও গভীর অস্থিরতার দিকে যাবে।